• সাতচল্লিশ নয়, ১২ বছর বাদে তেরঙ্গা উড়েছিল রানিনগরের চরের ছয় গ্রামে
    বর্তমান | ২৬ জানুয়ারি ২০২৬
  • তামিম ইসলাম, ডোমকল: ১৯৫০-এর ২৬ জানুয়ারি। দেশজুড়ে কার্যকর হল সংবিধান। ঐতিহাসিক দিন। কিন্তু তৎকালীন সময়ে পদ্মাপাড়ের রানিনগরের ছ’টি গ্রামে সেই সংবিধানের কোনও অস্তিত্ব ছিল না। হুকুমদারি থেকে আইন সবকিছুই চলত পূর্ব পাকিস্তানের নিয়মনীতি মেনে। কারণ, র‍্যাডক্লিফ লাইনের ‘ভুল আঁচড়ে’র পর মুর্শিদাবাদ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হলেও এই গ্রামগুলি রয়ে গিয়েছিল ওপারে পূর্ব পাকিস্তানের মানচিত্রে। তারপর দীর্ঘ অপেক্ষা। শেষে বছর বারো পরে ১৯৫৯ সালের ১৫ জানুয়ারি নেহরু–নূন চুক্তির ফলশ্রুতিতে এই ছ’টি গ্রাম ফিরে আসে ভারতের মানচিত্রে। তাই আজও রানিনগরের চরের ওইসব মানুষের কাছে ১৫ জানুয়ারি শুধু একটি দিন নয়, এটি সংবিধানের আলোয় ফিরে আসার স্মৃতি।পরাধীন ভারতবর্ষে পদ্মার তীর ঘেঁষে রানিনগরে তৎকালীন সময়ে ছিল ছ’টি গ্রাম। চর বাঁশগাড়া, চর সরন্দাজপুর, তারানগর, চর মাঝারদিয়াড়, খেদুরপাড়া ও চর বাথানপাড়া। বর্তমানে এই বিস্তীর্ণ এলাকা ভেঙে রানিনগর ১ ও ২ ব্লকের ১৪টি পৃথক গ্রামে বিভক্ত হয়েছে। সেই সময়ে গ্রামগুলির দু’পাশেই বয়ে যেত পদ্মা। ভারতীয় অংশে ছিল পদ্মার একটি শাখা নদী ও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের দিকে ছিল মূল পদ্মা।গ্রামের প্রবীণদের কথায়, মূল পদ্মা নয়, শাখা নদীকেই সীমান্তরেখা ধরে নেওয়া হয়েছিল। ফলে নদীর এপারে থেকেও তাঁরা হয়ে গিয়েছিলেন ভিনদেশি। যদিও ইতিহাসবিদদের মতে, এটি ছিল এক পরিকল্পিত রাজনৈতিক মানচিত্র বিভ্রাট। কূটনৈতিক কারণেই ওই ছয় গ্রামকে ভারতের মানচিত্রে নেওয়া হয়নি। স্বাধীনতার তিন দিন বাদে, ১৮ আগস্ট মুর্শিদাবাদ যখন ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়, তখনও ওই শাখা নদীকেই সীমান্ত ধরে নেওয়া হয়। ফলে স্বাধীন ভারতের মানচিত্রে ঠাঁই পায়নি শাখা পদ্মার ওপারের গ্রামগুলি। সেদিনও ওই গ্রামগুলির আকাশে ওড়েনি তেরঙ্গা। ওড়ানো হয়েছিল পাকিস্তানের পতাকা। চর বাথানপাড়ায় পাক আর্মির ক্যাম্পে উড়েছিল পাকিস্তানের পতাকা। তেরঙার স্বপ্ন দেখা মানুষগুলি বন্দি হয়ে পড়েছিল এক অচেনা শাসনের শিকলে। এমনকী, বছর তিনেক পরে, ১৯৫০ সালে ভারতে সংবিধান কার্যকর হলেও ওই গ্রামগুলিতে পৌঁছায়নি আলো। সেখানে তখনও চলত পূর্ব পাকিস্তানের হুকুমদারি। তবে হাল ছাড়েননি গ্রামবাসীরা। প্রতিবাদ থামেনি। দীর্ঘ আন্দোলনের পর ১৯৫৮ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ও তৎকালীন পাকি প্রধানমন্ত্রী ফিরোজ খান নুনের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় নেহেরু–নুন চুক্তি। তারই ফলশ্রুতিতে ওই গ্রামগুলি ভারতের অন্তর্ভূক্ত হয়। ১৯৫৯ সালের ১৫ জানুয়ারি দুপুর সওয়া বারোটা নাগাদ চর বাথানপাড়ার আকাশে নামানো হয় পাকিস্তানের পতাকা। উত্তোলন করা হয় ভারতের তেরঙ্গা। চারপাশে তখন ঢাক, ঢোলের বাজনা, গলায় গলায় স্বাধীনতার গান। ১২ বছর পরে যেন সত্যিকারের মুক্তির স্বাদ পেয়েছিল চরের গ্রামগুলি। আজ যেখানে রানিনগরের ১৪টি গ্রাম, একসময় সেই এলাকাতেই ছিল পাকিস্তানি শাসনের ছায়া। সেই ছায়া কেটে নতুন সূর্য উঠেছিল উনষাটের ১৫ জানুয়ারি।  এলাকার এক শিক্ষক বলছিলেন, ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হলেও আমাদের গ্রামগুলিতে স্বাধীনতা এসেছিল ১২ বছর বাদে। সংবিধানের আলোতেও আমরা এসেছিলাম ১২ বছর দেরিতে। ১৫ জানুয়ারি আমাদের কাছে শুধু একটা তারিখ নয়, এটা আমাদের অস্তিত্বের ইতিহাস। এই ইতিহাস আজও বাঁচিয়ে রেখেছেন চরের গ্রামবাসীরা। তাই তো প্রতিবছর ১৫ জানুয়ারি এখানে পালিত হয় ‘ভারত সংযুক্তিকরণ দিবস’।
  • Link to this news (বর্তমান)