ছেন্দাপাথরকে কেন্দ্র করে পর্যটন সার্কিট গড়ার ভাবনা
বর্তমান | ২৬ জানুয়ারি ২০২৬
রঞ্জুগোপাল মুখোপাধ্যায়, বাঁকুড়া: স্বাধীনতা সংগ্রামীদের স্মৃতি বিজড়িত ছেন্দাপাথরকে কেন্দ্র করে পর্যটন সার্কিট গড়ে ওঠার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে রাইপুরের বিধায়ক মৃত্যুঞ্জয় মুর্মু বনদপ্তরকে এব্যাপারে প্রস্তাব দিয়েছেন। বনদপ্তর বিধায়কের প্রস্তাব খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছে। বিধায়ক বলেন, ক্ষুদিরাম বসু সহ অন্যান্য বিপ্লবীদের পা পড়েছিল জঙ্গলমহলের ছেন্দাপাথরে। ওই এলাকাকে কেন্দ্র করে মুকুটমণিপুর ঝিলিমিলি সুতান তালবেড়িয়া, বড়দি পাহাড় সহ অন্যান্য পর্যটন কেন্দ্রগুলিকে নিয়ে একটি সার্কিট গড়ে তোলার ব্যাপারে প্রস্তাব দিয়েছি। যেহেতু ছেন্দাপাথর এলাকা বনদপ্তরের আওতায় রয়েছে। তাই ওই দপ্তরের আধিকারিকদের কাছে এনিয়ে আবেদন জানিয়েছি।বাঁকুড়া দক্ষিণের ডিএফও প্রদীপ বাউরি বলেন, নিয়মকানুন মেনে যতটা সম্ভব করা যায়, তা আমরা দেখব।উল্লেখ্য, দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল বাঁকুড়ার। এজেলার জল-জঙ্গলঘেরা প্রত্যন্ত এলাকাগুলিকে একসময় বিপ্লবীরা আত্মগোপনের জন্য বেছে নিতেন। ইংরেজদের লালচোখ উপেক্ষা করে জেলাবাসী দুঁদে বিপ্লবীদের আশ্রয় দিত। বাঁকুড়ার জঙ্গলমহলে চলত অস্ত্র প্রশিক্ষণ, বোমা বাঁধা সহ অন্যান্য গুপ্ত কাজকর্ম। জনশ্রুতি অনুযায়ী, বাঁকুড়ার রানিবাঁধ ব্লকের অন্তর্গত ঝিলিমিলির জঙ্গলের গুহায় ক্ষুদিরাম বসু, প্রফুল্ল চাকি, বারীন ঘোষের মতো স্বাধীনতা সংগ্রামীরা আশ্রয় নিয়েছিলেন। ওইসময় অম্বিকানগর রাজপরিবারের সদ্যসরা বিপ্লবীদের প্রধান পৃষ্টপোষক ছিলেন। তাঁদের সাহায্যেই ব্রিটিশ বিতারণের প্রস্তুতি সারতেন ভারতমাতার বীর সন্তানরা।স্বাধীনতার আগে জঙ্গলমহলের জনপদগুলি অনেক দুর্গম ছিল। ফলে অবিভক্ত বাংলার অন্যান্য এলাকায় ইংরেজরা সহজে যাতায়াত করতে পারলেও বিপদসঙ্কুল জঙ্গলমহল তাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকত। তাছাড়া ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ভয় ব্রিটিশদের তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াত। ফলে বিপ্লবীদের পক্ষে জঙ্গলমহল অনেকটা নিরাপদ আশ্রয়ের মতো ছিল। বর্তমানে বাঁকুড়া, পুরুলিয়া ও ঝাড়গ্রামের সংযোগস্থলে থাকা ঝিলিমিলি এলাকা তৎকালীন সময়ে বিপ্লবীদের অন্যতম পছন্দের স্থান ছিল। ওইসময় কোন কোন বিপ্লবী সেখানে আত্মগোপন করেছিলেন তা নিয়ে, মতভেদ থাকলেও ক্ষুদিরাম যে জেলায় পা রেখেছিলেন তা অনেকেই গবেষণা করে জেনেছেন। ১৯০৮ সালের আগস্টে ফাঁসির মঞ্চে ওঠার কিছুদিন আগেই তিনি ঝিলিমিলি ঘুরে গিয়েছিলেন বলে ইতিহাসবিদরা জানিয়েছেন। অম্বিকানগর রাজবাড়ির সদস্য রাইচরণ ধবলদেব স্বাধীনতা সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। তিনি বিপ্লবীদের আস্তানা গড়ে দিতেন। সেখানে জল, খাবারদাবার সহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র জোগানেরও ব্যবস্থা হতো রাজবাড়ির সদস্যদের নির্দেশে।ইতিহাসবিদরা জানিয়েছেন, রাজপরিবারের সাহায্যে ক্ষুদিরাম সহ অন্যান্য বিপ্লবীরা পাহাড়ের গুহায় থাকতেন। রাতের দিকে কখনও কখনও তাঁরা রাজবাড়ি ও আশাপাশের এলাকায় যেতেন। ঝিলিমিলি এলাকার ছেন্দাপাথরের গুহার মধ্যেই তাঁরা অস্ত্র প্রশিক্ষণ, বোমা বাঁধার কাজ সারতেন। বিশেষ এক ধরনের বোমাও ঝিলিমিলির ডেড়ায় তৈরি হতো। তা দিয়ে বহু ইংরেজকে পরবর্তীকালে নিকেশ করা হয়। ক্ষুদিরামের স্মৃতিতে কয়েকবছর আগে স্থানীয় পঞ্চায়েত সমিতি তথা প্রশাসনের উদ্যোগে ছেন্দাপাথরে ক্ষুদিরামের মূর্তি, শহিদ বেদি, উদ্যান প্রভৃতি তৈরি করা হয়। তবে ওই এলাকাকে আরও কিছুটা সাজিয়ে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন।তাঁদের মতে, এমনিতেই ঝিলিমিলিকে প্রকৃতি যেন তার সবকিছু উজার করে দিয়েছে। বাঁকুড়া শহর থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরের ওই এলাকার নৈসর্গিক সৌন্দর্য ভ্রমণপিপাষুদের বরাবর কাছে টেনে নিয়েছে। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের পদধূলিধন্য ওই এলাকাকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুললে সমগ্র অঞ্চলের উন্নয়ন হবে। এলাকায় নতুন নতুন হোটেল, হোম স্টে গড়ে উঠবে। অন্যান্য দোকানপাটও বসবে। ফলে ওই অঞ্চলের অর্থনীতি চাঙ্গা হবে। তবে ঝিলিমিলির বেশিরভাগ এলাকা বনদপ্তরের। ফলে পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার আগে সরকারিভাবে বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধিও গড়ে তোলা জরুরি।