• ‘কবিতা ভালবেসেই মাটিতে মিশে থাকতে চাই’, আবদার ভাইরাল ‘কবিতাওয়ালা’ চাষি আজিবরের
    বর্তমান | ২৬ জানুয়ারি ২০২৬
  • অগ্নিভ ভৌমিক, কৃষ্ণনগর: ‘কবিতাকে ভালবেসেই মাটিতে মিশে থাকতে চাই।’-ভাইরাল ‘কবিতাওয়ালা’ চাষি আজিবর মণ্ডলের আবদার শুধু এটুকুই। কখনও মাঠে চাষ করার সময়, আবার কখনও কাজ সেরে খেতের আল ধরে বাড়ি ফেরার পথে তিনি কবিতা আওড়ান। সেই মুহূর্তের ভিডিও এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল। যদিও সেব্যাপারে তাঁর একটুও আগ্রহ নেই। কিন্তু নেটিজেনদের টাইমলাইনে এখন ঘুরছেন আজিবর। মুখে একগাল হাসি নিয়ে, মাথায় গামছার ফেট্টি বেঁধে, ধূধূ মাঠ ও খেতের মাঝে কবিতা পাঠ করার সেই সহজ সাদামাটা ভিডিও সকলেরই মন ছুঁয়ে যাচ্ছে। চাষিদের নিয়ে দশকের পর দশক ধরে কবিরা বহু কবিতা লিখেছেন। তাঁদের জীবনযাপন, শ্রম, দুর্দশা ও আনন্দ কবিদের নানা সৃষ্টিতে বারবার জায়গা পেয়েছে। যেমন রবি ঠাকুর লিখেছেন- ‘আমরা  চাষ করি আনন্দে/ মাঠে মাঠে বেলা কাটে সকাল হতে সন্ধে’। কিন্তু এবার তা যেন উলটপুরাণ হচ্ছে। চাষের জমিতেই চাষির কণ্ঠে সেই সমস্ত কবিতা যেন অন্য মাত্রা পাচ্ছে। তাঁর বিচারে, ‘আমরা সবাই কবিতা। মাঠ-ঘাট, নদী-পুকুর, আকাশ-বাতাস সবই কবিতা। যুদ্ধ কবিতা। শান্তি কবিতা। সবকিছুই কবিতা।’নদীয়া জেলার করিমপুর ব্লকের প্রত্যন্ত গ্রাম কিশোরপুরে বাস করেন আজিবর মণ্ডল। বড়দা, মেজদা এবং তাঁদের স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে এক যৌথ পরিবারে তাঁর জীবন কাটে। অভাবই ছিল তাঁর জীবনের নিত্যসঙ্গী। আর্থিক অনটনের কারণে স্নাতক ডিগ্রির স্বপ্ন মাঝপথেই থেমে যায়। উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে পড়াশোনায় ইতি টানতে হয় তাঁকে। জীবিকার তাড়নায় খুব অল্প বয়সেই চাষবাসের কাজে নেমে পড়তে হয়। মুখোমুখি হতে হয় কঠিন বাস্তবতার।কিন্তু দারিদ্র্য কোনও দিনই আজিবরের কবিতার প্রতি ভালোবাসাকে মুছে দিতে পারেনি। ছোটবেলা থেকেই কবিতার সঙ্গে তাঁর এক গভীর আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সুযোগ পেলেই তিনি কবিতা পড়েন। আবার অবসর সময়ে নিজেই লিখে ফেলেন ছোটো ছোটো কবিতা। যদিও সেব্যাপারে জিজ্ঞেস করতেই কিছুটা লাজুক সুরে বলেন, ‘ওগুলোকে আর কবিতা বলবেন না।’প্রতিদিন ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই মাঠে চলে যান আজিবর। ধানখেত কিংবা কলাবনের মাঝে দাঁড়িয়ে চাষের কাজ চলতে থাকে। আর সেইসঙ্গে কানে বাজতে থাকে কবিতা। মোবাইল ফোনে কবিতা চালিয়ে সারাদিন শুনতে থাকেন তিনি। কখনও আবার নিজের কণ্ঠে কবিতা পাঠ করার মুহূর্তগুলি ফোনের ক্যামেরায় বন্দি করে রাখেন। মাটির গন্ধ মেখে থাকা সেই কবিতাপাঠই যেন তাঁর দিনের ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয়। তাই তিনি বলেন, কবিতাকে আমি আমার মতো করে ভালোবাসি। বছরখানেক আগে অনলাইনে কবিতা শেখার ক্লাসে যোগ দেওয়ার চেষ্টাও করেছিলেন আজিবর সাহেব। ইচ্ছে ছিল প্রথাগতভাবে কবিতা পাঠ শেখার। কিন্তু কাজের চাপ আর সময়ের অভাবে সেই চেষ্টা বেশি দূর এগোয়নি। তবুও কোনও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই তাঁর কণ্ঠে প্রাণ পেয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পরিচয়’, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘শুধু কবিতার জন্য’, জীবনানন্দ দাশের ‘আবার আসিব ফিরে’ কিংবা নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ‘অমলকান্তি’র মতো কালজয়ী কবিতাগুলি। সেই কবিতাপাঠের ভিডিও আজ সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। দিনের কাজ শেষে বাড়ি ফিরে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা। আর সেই আড্ডার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে ওঠে কবিতা পাঠ। আজিবর বলেন, আমার কবিতা পাঠ যে সকলের ভাল লেগেছে, এতেই আমি খুব খুশি। কিন্তু আমার ভয় লাগে এই ভেবে যে, আমি মাঠের লোক। তাই বেশি উপরে উঠলে আমি তো সামলাতে পারব না। আমি পড়ে যাব।‌  করিমপুরের কবিতাওয়ালা আজিবর মণ্ডল। -নিজস্ব চিত্র
  • Link to this news (বর্তমান)