• বদলে গিয়েছে চেনা স্বাদের ভুবন, লাল চায়ের সাম্রাজ্যে এখন মশলার আগ্রাসন
    এই সময় | ২৬ জানুয়ারি ২০২৬
  • সব্যসাচী ঘোষ, মালবাজার

    'এক কাপ চায়ে আমি তোমাকে চাই।'

    বাঙালির সঙ্গীত সাধনায় মাইলফলক হয়ে ওঠা এই গান চায়ের বিলাসকে আইকনিক অভিধা দিয়েছে। কিন্তু, গত তিন দশকে বেশ কিছুটা বদলে গিয়েছে চা পিয়াসীদের চেনা স্বাদের ভুবন। উত্তরবঙ্গেও লাল চায়ের সাম্রাজ্যে থাবা বসিয়েছে মশলা চা। বিভাজন তৈরি হয়েছে চা-খোরদের মধ্যে।

    লাল চা-কে আদর করে ডাকা হয় বাংলা চা। এ ক্ষেত্রে চা পাতার গুণমানই প্রধান। দার্জিলিং চায়ের ঘন লাল রং, ততোধিক ঘন তার স্বাদ। এই দোকানগুলিও আড্ডার কারখানা। কাপে তুফান তোলে রাজনীতি, খেলা থেকে সাহিত্য। জলপাইগুড়ি শহরের সমাজপাড়া মোড়ে কবি-সাহিত্যিকদের চায়ের ঠেক হয়ে উঠেছে বাংলা চায়ের ভরকেন্দ্র। ভালোবেসে দোকানের নাম রাখা হয়েছে 'সক্রেটিস'।

    কিন্তু 'সক্রেটিস'-দের আবেদন ক্রমশ কমছে। বাড়ছে দেহাতি চায়ের দোকান। এখানে চা পাতা গৌণ। ভারী ঘন দুধের সঙ্গে এলাচ -ও নানা সুগন্ধীর মিশ্রণ এই চায়ের ইউএসপি। কিসের সুগন্ধ? হরেক কিসিমের আয়ুর্বেদিক গুঁড়োর। মাটির ভাঁড় পুড়িয়ে অগ্নিবর্ণ হয়ে উঠলে তার মধ্যে চা ঢেলে দিলেই টগবগ করে ফুটতে শুরু করে। তন্দুরি চা এই দোকানগুলির জনপ্রিয় আইটেম। গত ১০ বছরে শিলিগুড়ি থেকে কোচবিহারে এই ধরনের দোকান খোলার প্রবণতা বেড়েছে। বিক্রিও বেড়েছে। দোকানের সাজগোজ, চায়ের ভাঁড় থেকে পরিবেশনের ধরন, আলাদা প্রায় সবকিছুই।

    জলপাইগুড়ি-আলিপুরদুয়ার জেলার সীমানায় তেলিপাড়া। দুই জাতীয় সড়কের সংযোগস্থলের দু'ধারে নিত্যনতুন চায়ের দোকান খুলেছে। আলিপুরদুয়ারে নাটক করতে এসে এখানে মশলা চা খেয়ে বাংলাদেশের বিখ্যাত অভিনেতা মোশারফ করিম তারিফ করেছিলেন। শিলিগুড়ি থেকে সেবক পেরিয়ে ওদলাবাড়ি, মালবাজার- এই পথে এলে অনেকেই দাঁড়িয়ে পড়েন দোকানে। নিয়মিতই আসেন কম বয়সের ছেলেমেয়েরা। যেমন শিলিগুড়ির সন্তু চৌধুরী। বলেন, 'দার্জিলিংয়ের লাল চায়ের কড়া তিতকুটে স্বাদে মজা পাই না। এলাচের সঙ্গে আদার গন্ধ ঘন দুধ চায়ে বাড়তি আনন্দ যোগ করে।'

    চা বিশেষজ্ঞ ইন্দ্রজিৎ লাহিড়ি বলেন, 'আমাদের ছোটবেলায় ওই দুধ আর লাল- দু'রকম চায়ের বাইরে ফুটপাতে অন্য চায়ের দোকান দেখিনি। এখন চায়ের নানা আয়োজন। মানুষের স্বাদ বদলাচ্ছে। সেই কারণে তন্দুর থেকে মশলা, নানা নাম নিয়ে অদ্ভুত চায়ের দোকানও খুলছে।'

    মশলার পাশে সাবেকি চায়ের ক্রেজ় কমে যাওয়ার জন্য অনেকটা দায়ী চা পাতার গুণমান। ভালো অর্থোডক্স চা পাতার যোগান কমে গিয়েছে। চা বিশেষজ্ঞ ও চা বাগানের ম্যানেজারের কাজ সামলানো রাজকুমার মণ্ডল বলেন, 'দার্জিলিংয়ে বাগানের হাল খারাপ হচ্ছে। তাই ভালো চায়ের দাম ও চাহিদা দুই বাড়ছে। মশলা বা দুধ চায়ের জন্য সিটিসি চা সব জায়গায় খুবই সহজলভ্য।'

    মালবাজারের তিন প্রজন্মের চায়ের দোকান সামলান দুই ভাই। সান্টু ও গোপাল দাস। দার্জিলিংয়ের সঙ্গে ডুয়ার্স, দু'ধরনের চায়ের গুঁড়োর ব্লেন্ড তৈরি করেন। এখানকার কড়া লিকারের স্বাদ নিতে অনেক চা প্রেমী আসেন। কমবয়েসিরা তুলনায় কম। সান্টু বলেন, 'আমরা চা বলতে চা-টাকেই বুঝি। চায়ের চুমুকে মস্তিষ্ক সজাগ হবে। খানিকটা তেতো স্বাদ। নতুন জেনারেশন বোধহয় সেটা পছন্দ করছে না।'

    তাই এখন রমরমা ধর্মেন্দ্র শা-দের। তেলিপাড়ার দোকানে এক গামলা দুধে এলাচের গুঁড়ো মেশাতে মেশাতে বলেন, 'স্কুল-কলেজের পড়ুয়া থেকে শুরু হয় আমাদের কাস্টমার। ওদের মনমর্জির সঙ্গে দোকানের মেজাজ মিলে যায়। তাই আমার কলেজ পড়ুয়া ছেলে রাহুলকেও এই লাইনে নিয়ে এসেছি।'

    অর্থাৎ ভবিষ্যতেও বদলের আভাস। রাজকুমারের কথায়, 'পরিবর্তন তো একটা হয়েছে। কিন্তু বাংলা হোক বা বাংলার বাইরের থেকে আসা নতুন স্বাদের চায়ের ঘরানা, আখেরে চা-কে ঘিরেই তো চলছে সব। মন্দ কী, চলুক না।'

  • Link to this news (এই সময়)