দিগন্ত মান্না, পাঁশকুড়া
এখনও মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে বাড়িটা। পথচলতি লোকজন পাশ দিয়ে যাওয়ার সময়ে বলেন, 'এই বাড়িতেই এসেছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু!' শুধু পথচলতি লোকজনই নন, এ কথা জানেন তামাম এলাকার লোকজন। তবে অহঙ্কারের রেশ ফুরিয়ে যায় মুহূর্তেই। বরং ক্রমশ প্রকট হয়ে ওঠে অভিমান আর অনুযোগ- 'বাড়িটা এখনও সংরক্ষণ করা গেল না।'
পাঁশকুড়ার স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আন্দোলন এক সময়ে ইংরেজদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল। প্রতি বছর নেতাজির স্মৃতি জড়ানো, স্বাধীনতা সংগ্রামী ইন্দুমতী ভট্টাচার্যের বাড়িতে পালন করা হয় নেতাজি জন্মজয়ন্তী। স্থানীয় লোকজনের দাবি, ওই বাড়িটি সংরক্ষণ করা হোক।
১৯৩৮-এর ১১ এপ্রিল তমলুকে একটি জনসভায় যোগ দেওয়ার জন্য রেলপথে হাওড়া থেকে রওনা দেন নেতাজি। দুপুরে তিনি পৌঁছে যান পাঁশকুড়া স্টেশনে। সেখানে নেতাজিকে তমলুক মহকুমা কংগ্রেস কমিটির পক্ষ থেকে সতীশচন্দ্র চক্রবর্তী সংবর্ধনা জানান। পাঁশকুড়া স্টেশন লাগোয়া এলাকায় জীবনচন্দ্র খাঁড়া নামে এক চিকিৎসকের ডিসপেনসারি ছিল। নেতাজি গিয়ে সেখানে বসেন। সেই সময়ে স্থানীয় কয়েক জনের সঙ্গে তিনি কথাও বলেন।
তারপর পাঁশকুড়া স্টেশন থেকে তমলুক-পাঁশকুড়া রাজ্য সড়ক ধরে নেতাজির কনভয় এগোতে থাকে। তখন রাস্তায় পিচ ছিল না। সাদা নুড়ি দিয়ে তৈরি হতো রাস্তা। তমলুক পাঁশকুড়া রাজ্য সড়কে তখন ছোট আকারের মোটর বাস চলাচল করত। ওই পথ ধরে এগোতে থাকে নেতাজির কনভয়। পাঁশকুড়ার জোড়াপুকুর এলাকায় তমলুক-পাঁশকুড়া রাজ্য সড়কের পাশে স্বাধীনতা সংগ্রামী ইন্দুমতী ভট্টাচার্যের বাড়ি। ইন্দুমতীর ছেলে শ্যামদাস ভট্টাচার্যও ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী। সে দিন তমলুকের জনসভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন ইন্দুমতী।
জনসভার জন্য সে দিন ভট্টাচার্য বাড়িতে কেউ ছিলেন না। নেতাজির সঙ্গে দেখা করার জন্য সে দিন ইন্দুমতীর বাড়ির সামনে জড়ো হয়েছিলেন স্থানীয় আটবেড়িয়া, চণ্ডীপুর ও গৌরাঙ্গপুর গ্রামের মানুষজন। নেতাজির কনভয় আটকানোর জন্য গ্রামবাসীরা ফুলের মালা দিয়ে পথ আটকে ছিলেন। গ্রামবাসীদের অনুরোধে ইন্দুমতীর বাড়ির সামনে একটি ছোট জনসভা করেন নেতাজি। বক্তব্য রাখার জন্য ইন্দুমতীর বাড়ির সামনে একটি তক্তপোষেরও ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
তক্তপোষের উপরে দাঁড়িয়ে সে দিন স্বাধীনতা সাংগ্রামীদের উদ্দেশে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রেখেছিলেন নেতাজি। সেখান থেকে নেতাজির কনভয় এগোতে থাকে তমলুকের দিকে। ইন্দুমতীর বাড়ির কিছুটা দূরে বটতলা এলাকায় নেতাজিকে স্বাগত জানানোর জন্য একটি তোরণ তৈরি করেছিলেন স্থানীয় স্বাধীনতা সংগ্রামী গুরুপ্রসাদ মণ্ডল। সেখানে উপস্থিত গ্রামবাসীরা নেতাজির গাড়ির উপরে পুষ্পবৃষ্টি করেছিলেন। শুধু নেতাজি নন, ইন্দুমতীর বাড়িতে অজয়কুমার মুখোপাধ্যায়, সুশীলকুমার ধাড়া, প্রফুল্লচন্দ্র সেন, রজনীকান্ত প্রামাণিকের মতো বহু বিশিষ্ট স্বাধীনতা র সংগ্রামীর যাতায়াত ছিল। সে সময়ে জোড়াপুকুরের ভট্টাচার্য বাড়ি ও তার অদূরে চৈতন্যদিঘির কংগ্রেস ঘরকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল বিপ্লব-তীর্থ। ইন্দুমতী তাঁর দুই ছেলেকে নিয়ে আইন অমান্য আন্দোলনে যোগ দেওয়ায় ব্রিটিশ সরকার তাঁর বাড়ির একাংশ বাজেয়াপ্ত করেছিল। গান্ধী-আরউইন চুক্তির পরে ব্রিটিশরা বাধ্য নি হয় ঘরের দখল ছেড়ে দিতে। ২০১৩-এর বন্যায় চৈতন্যদিঘির কংগ্রেস ঘরটি ধ্বংস হয়ে গেলেও আজও অক্ষত রয়েছে জোড়াপুকুরে নেতাজির স্মৃতি বিজড়িত বাড়িটি।
ওই বাড়ির বর্তমান মালিক গৌতম মাইতি নামে স্থানীয় এক ব্যক্তি। ২০১২-তে তিনি বাড়িটি সংস্কার করেন। প্রতি বছর ২৩ জানুয়ারি ওই বাড়িতেই নেতাজির জন্মজয়ন্তী পালন করেন স্থানীয় মানুষজন। স্বাধীনতা আন্দোলনের সাক্ষী, নেতাজির স্মৃতি বিজড়িত ইন্দুমতী ভট্টাচার্যের বাড়িটি সংরক্ষণের দাবি উঠেছে।
আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক সুধাংশুশেখর ভট্টাচার্য বলেন, 'ইন্দুমতী ভট্টাচার্যের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে সভা করেছিলেন নেতাজি। ওই বাড়িতে বহু স্বাধীনতা সংগ্রামীর যাতায়াত ছিল। সরকারের উচিত বাড়িটিকে অবিলম্বে হেরিটেজ ঘোষণা করে সংরক্ষণ করা।'