• মসলিন এবং কাঁথা স্টিচ বাংলায় নিয়ে এল পদ্মশ্রী
    আজকাল | ২৬ জানুয়ারি ২০২৬
  • আজকাল ওয়েবডেস্ক: বীরভূম জেলার জন্য ফের এক গর্বের মুহূর্ত। ২০২৬ সালের পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত হচ্ছেন সিউড়ির বিশিষ্ট শিল্পী তৃপ্তি মুখোপাধ্যায়।

    শিল্পকলার ক্ষেত্রে বিশেষত বাংলার ঐতিহ্যবাহী কাঁথা স্টিচের মাধ্যমে নারী স্বাবলম্বীকরণে তাঁর দীর্ঘদিনের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবেই এই মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সম্মান পাচ্ছেন তিনি।

    এর আগে তাঁর ঝুলিতে রয়েছে রাষ্ট্রপতি পুরস্কার এবং ২০১৬ সালে প্রাপ্ত শিল্পগুরু সম্মাননা। একের পর এক স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে তাঁর কাজ যে জাতীয় স্তরে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে, পদ্মশ্রী সম্মান তারই প্রমাণ। 

    পদ্মশ্রী প্রাপ্তির খবর পেয়ে স্বভাবতই আবেগাপ্লুত তৃপ্তি মুখোপাধ্যায়। এই সম্মান তিনি উৎসর্গ করেছেন তাঁর মা মায়া বন্দ্যোপাধ্যায়কে। পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে ছোটবেলায় মায়ের কাছ থেকেই কাঁথা স্টিচের সূক্ষ্ম কাজ শেখার শুরু।

    সুতো, কাপড় ও নকশার সঙ্গে তাঁর পরিচয় তখন থেকেই। শিল্পমনস্ক পারিবারিক পরিবেশে বড় হয়ে ওঠা তৃপ্তি মুখোপাধ্যায় ধীরে ধীরে এই কাজকেই নিজের জীবনের মূল লক্ষ্য হিসেবে বেছে নেন।

    ছোট থেকে তিনি কাঁথা স্টিচকে শুধুমাত্র শিল্পচর্চার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। গ্রামে গ্রামে ঘুরে দরিদ্র ও প্রান্তিক মহিলাদের এই কাজে যুক্ত করতে শুরু করেন। নিজের হাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে তাঁদের দক্ষ করে তোলাই ছিল তাঁর মূল উদ্দেশ্য।

    বীরভূম জেলার পাড়ুই, মঙ্গলডিহি, শাহপুর, বামুনডিহি সহ একাধিক গ্রামে আজ তাঁর প্রশিক্ষিত মহিলারা ছড়িয়ে রয়েছেন। বর্তমানে প্রায় ৪ হাজার মহিলা তাঁর অধীনে সরাসরি প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন এবং এখনও পর্যন্ত প্রায় ২০ হাজার মহিলা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কাঁথা স্টিচের মাধ্যমে রোজগারের পথ খুঁজে পেয়েছেন।

    এই প্রশিক্ষণ শুধু কাজ শেখানোতেই সীমাবদ্ধ নয়। আত্মবিশ্বাস, আত্মসম্মান এবং নিজের পায়ে দাঁড়ানোর মানসিক শক্তি গড়ে তুলতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছেন।

    তাঁর কাছে প্রশিক্ষণ নিয়ে অনেক মহিলা রাজ্য ও জাতীয় স্তরে বিভিন্ন পুরস্কারও পেয়েছেন, যা তাঁর কাজের গুণমান ও গভীরতার পরিচয় বহন করে।

    বাংলার কাঁথা স্টিচকে আন্তর্জাতিক স্তরে তুলে ধরতেও অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছেন তৃপ্তিদেবী। ভারত সরকারের উদ্যোগে তিনি লন্ডন, বার্মিংহাম ও টোকিও সফর করে এই ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্পকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরেছেন। 

    বিদেশের মাটিতে তাঁর কাজ প্রশংসিত হয়েছে এবং ভারতীয় লোকশিল্পের প্রতি আন্তর্জাতিক আগ্রহ আরও বেড়েছে। বর্তমানে তিনি বিশেষভাবে আদিবাসী মহিলাদের কাঁথা স্টিচের প্রশিক্ষণের উপর জোর দিচ্ছেন।

    লক্ষ্য একটাই—প্রান্তিক মহিলাদের জন্য স্থায়ী রোজগারের পথ তৈরি করা। তাঁর বিশ্বাস, এবারের পদ্মশ্রী সম্মান তাঁর এই সামাজিক ও শিল্পসাধনাকে আরও বিস্তৃত করার অনুপ্রেরণা দেবে।

    তৃপ্তি মুখোপাধ্যায়ের এই সাফল্য শুধুমাত্র একজন শিল্পীর ব্যক্তিগত অর্জন নয়। এটি বীরভূম জেলার হাজার হাজার মহিলার আত্মনির্ভরতার গল্প, সংগ্রামের গল্প এবং সাফল্যের গল্প। কাঁথা স্টিচের প্রতিটি সেলাইয়ের মধ্যে তিনি যে স্বপ্ন বুনে দিয়েছেন, পদ্মশ্রী সম্মান সেই স্বপ্নেরই জাতীয় স্বীকৃতি। 

    অন্যদিকে মসলিন শাড়ির উপর অনন্য কাজের দরুন এবছর পদ্মশ্রী পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন কালনা বারুইপাড়ার বাসিন্দা তাঁতি জ্যোতিষ দেবনাথ( ৬৮)। 

    বাবা কৃষ্ণমোহন দেবনাথের হাত ধরে তার এই পেশায় প্রবেশ। এর আগে তিনি রাষ্ট্রপতি পুরস্কার-সহ একাধিক পুরস্কারে মনোনীত হয়েছেন।

    তিনি বলেন, দাদু দেবেন্দ্রমোহন দেবনাথ বাংলাদেশের নোয়াখালির বাসিন্দা ছিলেন। পরবর্তী সময়ে বাবার সঙ্গে কালনার  দত্ত দারিয়াটন গ্রামে এসে ওঠা। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা।

    তারপর বাবার কাছ থেকে তালিম নিয়ে একের পর এক মসলিন শাড়ি বানিয়ে সকলের নজর কারা। জ্যোতিষ বাবুর স্ত্রী যুথিকা দেবনাথ বলেন, 'আমার ৪৫ বছরের দাম্পত্য জীবন। প্রথমদিকে একটু মানিয়ে নিতে অসুবিধা হলেও আমি এখন যথেষ্ট ভালো তাঁত বুনতে শিখে গেছি। আমাদের একমাত্র ছেলে সেও টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার। আমার শ্বশুরমশাইকে সকলে সম্রাট বলে ডাকতেন। আর এখন আমার স্বামী পদ্মশ্রী পুরস্কারপ্রাপ্ত তাঁতি ভাবতেও বেশ ভালো লাগছে।'

    জ্যোতিষ বাবুর ছেলে রাজীব দেবনাথ বলেন, 'বাবার পাওয়া একের পর এক পুরস্কারে আমাদের গর্বে বুক ভরে যাচ্ছে। জ্যোতিষ বাবু বলেন, আগামী প্রজন্ম যদি এই সমস্ত কাজে আগ্রহী  হয়ে এগিয়ে আসেন তাহলে আমার কাজ সার্থক হবে। এই সাফল্য শুধুমাত্র আমার একার নয়, সকলের ভালবাসাতেই এই সাফল্য আমার কপালে জুটেছে।'
  • Link to this news (আজকাল)