গাড়ি বিক্রির পরে মালিকানা বদলে নজর বাড়ুক, দাবি রেড রোড-কাণ্ডে
আনন্দবাজার | ২৬ জানুয়ারি ২০২৬
গাড়ির হাতবদল হয়েছে মালিকানার বদল ছাড়াই। বেনামি সেই গাড়ি নিয়েই বেপরোয়া গতিতে রেড রোডে প্রজাতন্ত্র দিবসেরকুচকাওয়াজের মহড়া চলাকালীন ঢুকে পড়তে গিয়ে শনিবার গ্রেফতার হয়েছেন ২১ বছরের এক যুবক। যে ঘটনায় অনেকেরই মনে পড়ে গিয়েছে, ১০ বছর আগের এমনই এক কুচকাওয়াজ মহড়ায় রেড রোডে ঢুকে পড়া বেপরোয়া গাড়ির ধাক্কায় বায়ুসেনার কর্পোরাল অভিমন্যু গৌড়ের মৃত্যুর ঘটনা। শনিবারের ঘটনায় ধৃত যুবক পরে জামিন পেলেও এমন বেনামি গাড়ির ব্যবহার শহরে বন্ধ করা যাচ্ছে না কেন, সেই প্রশ্ন উঠছে। সম্প্রতি এমন গাড়িই বিস্ফোরণে যুক্ত ছিল দিল্লিতে। রাজধানীতে বিস্ফোরণের জেরে আতঙ্কের আবহের মধ্যেও অনেকে প্রশ্ন তুলেছিলেন, মালিকানা বদল ছাড়াই গাড়ির হাতবদলের এমন বেআইনি কাজ বন্ধ করা যায় না কেন?
জানা গিয়েছে, শনিবারের ঘটনায় জড়িত যুবক আরমান আগরওয়াল যে গাড়িটি চালাচ্ছিলেন, সেটি ২০২১ সালের জুলাই মাসে প্রথম কেনা হয়েছিল। কিন্তু ২০২৩ সালের জুলাই মাসে গাড়িটির দূষণ সংক্রান্ত শংসাপত্রের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। গাড়িটির বিমাও ২০২৪ সালের জুলাই মাস থেকে নেই। রেড রোডের নিরাপত্তা বলয়ে ঢুকে পড়া তো পরের কথা, এমন গাড়িশহরের রাস্তায় চলারই কথা নয়। এই সূত্রেই যোগাযোগ করা হয়েছিল পরিবহণ দফতরে। সেখানে গাড়ির রেজিস্ট্রেশন নম্বর যে ফোন নম্বরের সঙ্গে যুক্ত, অর্থাৎ, যে ফোন নম্বরটি গাড়ির মালিকের নম্বর হিসাবে পরিবহণ দফতরের খাতায়নথিভুক্ত রয়েছে, সেটিতে যোগাযোগ করা হলে জানা যায়, হাওড়ার বেনারস রোডের একটি ইস্পাতের কারখানার নামে গাড়িটি কেনা হয়েছিল। এক ব্যক্তি ফোন ধরে বলেন, ‘‘গাড়িটি আমিই প্রথম কিনেছিলাম। কিন্তু বিক্রি করে দিয়েছি।’’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ব্যক্তির এর পরে দাবি, ‘‘নাম বদল করানো হয়নি। করে নেওয়া হবে।’’
সূত্রের খবর, তদন্তে নেমে পুলিশও এই বিষয়েই ধাক্কা খেয়েছে। পুলিশের একটি সূত্রের দাবি, ‘‘গাড়িটি হাতবদল হয়েছিল। যে যুবক গাড়িটি চালাচ্ছিলেন, তিনি তাঁর বাবার সঙ্গে মিলে গাড়ি কেনা-বেচার ব্যবসা করেন। ওই গাড়ি নিয়েই যুবক সকালে বন্ধুদের সঙ্গে চা খেতে বেরিয়েছিলেন।’’ কিন্তু গাড়ি কেনা-বেচার ব্যবসার সূত্রে ডিলারের হাতে আসা গাড়ি তো ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করারই কথা নয়!
পরিবহণ দফতর সূত্রের খবর, হাতবদল হলেও মালিকানা বদল না হওয়া এমন বেশ কয়েকটি গাড়ি অপরাধ ঘটানোর কাজে ব্যবহার হয়েছে বলে সাম্প্রতিক অতীতে সামনে এসেছে। বর্ধমানের শক্তিগড়েকয়লা ব্যবসায়ী রাজেশ ওরফে রাজু ঝা-কে খুনের ঘটনায় অভিযুক্তেরা যে গাড়িতে এসেছিল, সেটি পঞ্চসায়রের এক মহিলার বলে পুলিশপ্রথমে জানতে পারে। সেই মহিলার ঠিকানায় তদন্তকারীরা পৌঁছলে তাঁর ছেলে পুলিশকে জানান,বছরখানেক আগে একটি সংস্থাকে গাড়িটি বিক্রি করে দিয়েছিলেনতাঁরা। সম্প্রতি ই এম বাইপাসে পর পর দু’টি গাড়িতে ধাক্কা মেরে এক পথচারী ও এক সাইকেলআরোহীকে পিষে দেওয়ার ঘটনায় জড়িত গাড়িটি ২১ বছরের এক যুবক চালালেও সেটি আদতে ছিল এক স্কুলশিক্ষকের নামে। এর পরেই সামনে আসে দিল্লিতে এমন গাড়ি ব্যবহার করে বিস্ফোরণের পরিকল্পনা করার কথা।
পরিবহণ দফতরের এক কর্তার দাবি, এই কারণেই আইন কড়া করার পাশাপাশি বেশ কিছু ছাড়ও দেওয়া হয়েছে। গাড়ির মালিক অনলাইনেই সমস্তটা করতে পারবেন এখন। যিনি গাড়ি কিনছেন, তাঁকে শুধু রিজিয়োনাল ট্রান্সপোর্ট অফিসেযেতে হবে। গাড়ি বেচা-কেনার সঙ্গে যুক্ত ডিলারের মাধ্যমে গাড়ি বিক্রি করলে ২৯এ ফর্ম মালিককে দেবেন সংশ্লিষ্ট ডিলার। এতে তিনি যে ডিলারকে গাড়ি দিয়েছেন, তারপ্রমাণ তৈরি হয়ে যাবে। যত দিন গাড়িটি ওই ডিলারের কাছে থাকবে, তত দিন কোনও ভাবেই তিনি বাণিজ্যিক বা ব্যক্তিগত কাজে সেটি ব্যবহার করতে পারবেন না। প্রতি সপ্তাহে এমন গাড়ির বিস্তারিত তথ্য পরিবহণ দফতরে জানাতে হবে, যাতে তা ‘বাহন’ পোর্টালে অন্তর্ভুক্ত করা যায়। সঙ্গে ডিলারকে পুরনো গাড়ির ডিলার হিসাবে লাইসেন্স নিতে হবে। কিন্তু এর পরেও পরিস্থিতি বদলায় না কেন? স্পষ্ট উত্তর মেলে না কোনও পক্ষ থেকেই।