গোপাল সাহা: ‘ইট কাঠ পাথরের শহরে ভালবাসার কারবার’। নচিকেতার গানের এই কথা সার্থক করল কলকাতা পুলিশ। কংক্রিটের জঙ্গলেও যে সবুজের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখা যায়, তারই এক অনন্য দৃষ্টান্ত গড়ে তুলেছেন কলকাতা পুলিশের সার্জেন্ট শুভঙ্কর চ্যাটার্জি। সহযোগিতায় হেয়ার স্ট্রিট থানার ওসি সত্য দাশগুপ্ত। পাশাপাশি সার্জেন্ট শুভঙ্কর সরকার এবং থানার সকল অফিসার ও কর্মীদের যৌথ প্রচেষ্টার ফল।
২০১৪ সালে কলকাতা পুলিশে যোগ দেওয়া এই পুলিশকর্মী বর্তমানে শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সেন্ট্রাল ডিভিশনের হেয়ার স্ট্রিট থানায় দায়িত্ব পালন করছেন। তবে আইন–শৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি তাঁর আরেক পরিচয়–তিনি একজন কৃষকের সন্তান। যাঁর মন আজও বাঁধা পড়ে আছে মাটির গন্ধে।
বলাবাহুল্য শুভঙ্করের শিকড়ের টান যে গ্রামে, তা বারবার প্রমাণও করে। বাঁকুড়া জেলার বাসিন্দা শুভঙ্কর চ্যাটার্জির চোখে আজও ভাসে গ্রামের সবুজ ধানক্ষেত, শাকসবজির মাঠ আর খোলা আকাশ। সেই টানই তাঁকে ব্যস্ত মহানগর কলকাতার মাঝেও কৃষির সঙ্গে যুক্ত রেখেছে। আর সেই ভালবাসা থেকেই জন্ম নিয়েছে এক অভিনব উদ্যোগ–ধর্মতলার প্রাণকেন্দ্রে সবজি চাষ।
শীতের দিনে ব্যস্ত ধর্মতলা চত্বর। ঠিক সেখানেই হেয়ার স্ট্রিট থানার একটি আউটপোস্ট। থানার অফিসার ইনচার্জ সত্য দাসগুপ্তর সার্বিক তত্ত্বাবধান এবং থানার সকল পুলিশকর্মীর সম্মিলিত সহযোগিতায় আউটপোস্টের সামান্য ফাঁকা জায়গাটুকু কাজে লাগিয়ে শুরু হয় সবজি চাষ।
নিজের হাতে কোদাল তুলে মাটি প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে নিয়মিত পরিচর্যা–সবটাই করেছেন থানার পুলিশকর্মীরাই। তার ফল আজ চোখে পড়ার মতো। ছোট্ট সেই জায়গাতেই ফলছে বাঁধাকপি, ফুলকপি, লাল শাক, পালং শাক, বেগুন সহ নানান ধরনের তাজা শাকসবজি। পাশাপাশি রঙিন ফুলের গাছ ধর্মতলার ব্যস্ততার মাঝে এনে দিয়েছে এক টুকরো শান্তি ও প্রকৃতির ছোঁয়া।
এই উদ্যোগের সুফল শুধু পুলিশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। হেয়ার স্ট্রিট থানার পুলিশকর্মীদের পাশাপাশি ধর্মতলা চত্বরে ফুটপাতে বসবাসকারী অসহায় মানুষজনের হাতেও পৌঁছে গেছে এই সবজি।
বলাবাহুল্য, যারা রাস্তায় রান্না করে দিন কাটান–ভিক্ষুক থেকে শুরু করে দরিদ্র পথবাসী মানুষজন, সকলেই কৃতজ্ঞতার সঙ্গে গ্রহণ করেছেন এই মানবিক সহায়তা।
স্থানীয় ফুটপাথবাসিদের কথায় উঠে এসেছে কৃতজ্ঞতার সুর। কঠিন ও চাপযুক্ত পুলিশি দায়িত্বের মাঝেও এমন মানবিক উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসার যোগ্য। থানার অফিসার ইনচার্জ সত্য দাশগুপ্ত থেকে শুরু করে প্রতিটি পুলিশকর্মীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠা এই সবজি চাষের উদ্যোগ পুলিশের প্রতি সাধারণ মানুষের বিশ্বাস ও শ্রদ্ধাকে আরও দৃঢ় করেছে।
আইন–শৃঙ্খলা রক্ষার ইউনিফর্মের আড়ালেও যে মানবিক মন, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং প্রকৃতির প্রতি গভীর ভালবাসা বেঁচে থাকতে পারে–ধর্মতলার বুকে গড়ে ওঠা এই সবুজ উদ্যোগ তারই নীরব অথচ শক্তিশালী প্রমাণ। হেয়ার স্ট্রিট থানা আজ শুধু থানাই নয়, মানবিকতার এক উজ্জ্বল ঠিকানা।