• আজও ফেরত আসে প্রচেত গুপ্তর লেখা, মনখারাপ থাকলেও হাসির গল্প লিখতে পারেন উল্লাস মল্লিক
    এই সময় | ২৭ জানুয়ারি ২০২৬
  • লেখা পাঠালে এখনও অনেক সময়ে সেই লেখা ফেরত চলে আসে! সাহিত্যিক প্রচেত গুপ্তের মুখে এ কথা শোনা মাত্রই হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলেন শ্রোতারা। প্রচেত গুপ্ত। যাঁর নাম শুনলেই চোখের সামনে কিশোর সাহিত্যের প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে, এক রাশ রংবেরঙের দুনিয়ার দেখা মেলে, যাঁর লেখার মোহে আটকে গিয়েছে বহু বাঙালির কিশোরকাল, তাঁর লেখা ফেরত পাঠিয়ে দেন প্রকাশক?

    দর্শকেরা আশ্চর্য হলেও, প্রচেতর কাছে লেখা ফেরত আসাটা ইতিবাচকই। তাঁর মতে, ফেরত আসাটা যত দিন থাকবে, তত দিন বুঝতে হবে সাহিত্য ঠিক আছে। সম্পাদক যত দিন মনে করবেন, তোমাদের লেখা হলো না, তত দিন আমাদের সাহিত্য ঠিক থাকবে। পাঠক যত দিন বইটা ফেরত দেবেন, তত দিন আমাদের সাহিত্য ঠিক থাকবে। ভালো না লাগলে তো বলবেই। তবেই তো ভালো লাগলে আসল কথাটা বেরোবে। সে জন্য, ফেরত আসাটা মোটেই লজ্জার নয়।

    পাশেই ছিলেন উল্লাস মল্লিক। বর্তমান সময়ের আর এক স্বনামধন্য কথাকার। প্রচেতর অনুজপ্রতিম হলেও, বন্ধুই তাঁরা। উল্লাসও মজার ছলে হাসতে হাসতে বললেন, হ্যাঁ, আমার লেখাও ফেরত আসে। প্রচেতর যে বার বেশি ফেরত আসে, আমাকে পাঠায়। আমার একটা অনলাইন পত্রিকা আছে। ওখানে ছাপার জন্য পাঠায়। এর জন্য টাকার অফারও দিয়েছে!

    সোমবার সন্ধ্যায় এই দুই প্রখ্যাত সাহিত্যিককে নিয়ে এমনই মজার আড্ডা-আলোচনা হল ৪৯তম আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলায় ‘এই সময়’-এর প্যাভিলিয়নে। সল্টলেকের সেন্ট্রাল পার্কে মেলার মাঠের চার নম্বর গেট দিয়ে ঢুকে একটু এগোলেই ‘এই সময়’-এর স্টল। এ বারেও প্রচেতর নতুন বই বেরিয়েছে। বই প্রকাশিত হয়েছে উল্লাসেরও। কিন্তু অনেক কাল আগে প্রচেত ঠিক করেছিলেন, যদ্দিন না বই বেরোবে, তদ্দিন বইমেলা যাব না!

    ছোটবেলার সেই কথা উঠতেই হেসে ফেললেন প্রচেত। বললেন, ‘আমি সত্যিই ভেবেছিলাম, এত লোকের বই বেরোয়, আর আমার কোনও বই নেই! আমি আর বইমেলায় ঢুকবই না। এই রাগটা ঠিক কার উপরে? এটা ভাবতে ভাবতেই পরের বইমেলা চলে আসত। রাগ-অভিমানের থেকেও এটা আসলে একটা জেদ যে, আমিও একদিন বই লিখব। তখন তো জানতাম না যে, বই লিখলেই সেটা আসলে বই হয় না। যেমন লেখা লিখলেই সেটা লেখা হয় না। তেমনই দুই মলাটের মধ্যে পাতা পুরে দিয়ে বললাম চলো বইমেলা, তা হয় না। তা যাই হোক, আমি কিছু লিখতে পেরেছি। অনেক দিন বইমেলায় আসছি।’

    কিন্তু তখনকার সেই বইমেলা আর আজকের বইমেলার মধ্যে কি কোনও ফারাক আছে? উল্লাস বলেন, ‘আগের চেয়ে লোকসমাগম বেড়েছে। একটু তো শব্দকল্পদ্রুমে মুছে যাচ্ছি। বিভিন্ন স্টল থেকে ঠিকরে ঠিকরে আওয়াজ বেরোচ্ছে। তবে আগের মতো এখনও সেই উষ্ণতা আছে।’

    ফিরে আসা গল্পের সূত্র ধরেই আলোচনায় প্রচেতর নতুন বই ‘সাজগোজের বাক্স’-র কথাও উঠেছে। এই বইয়ের ভূমিকায় প্রচেত লিখেছেন, ‘অনেকে বলেন বেশি লেখা মোটেই ভালো নয়। কম লিখলেই লেখা ভালো হয়। আমি পরীক্ষা করেছিলাম। ভালো লেখার লোভে এক বার টানা ছ'মাস কিছুই লিখলাম না। সপ্তম মাসে যেটা লিখলাম, সম্পাদক শুধু অমনোনীত বলে ফিরিয়েই দিলেন না, এক লাইন লিখেও দিলেন, বোঝাই যাচ্ছে আপনি অনেক দিন লেখালেখির মধ্যে নেই। মাস ছ'য়েক হাত পাকিয়ে তার পরে পাঠাবেন। শীত পড়েছে। সাবধানে থাকবেন।’

    এটা কি সত্যি ঘটনা? তৎক্ষণাৎ প্রচেতর জবাব, ‘সমস্ত কথা সত্যি। যা বলি, যা ভাবি, যা লিখি— সব সত্যি।’ তাঁর এই কথার সূত্র ধরেই ছিল পরের প্রশ্ন, সত্যিই বিরতির প্রয়োজন? উল্লাসের রসসিক্ত জবাব, কুঁড়েমির জন্যই তাঁর বিরতির প্রয়োজন। তাঁর কথায়, ‘এটা তো লেখকের উপরে নির্ভর করে। দু’-এক বার মনে হয়েছে, বিরতি প্রয়োজন। আসলে আমার লিখতেই খুব খারাপ লাগে। প্রয়োজন কি না, জানি না। মনে হয় যেন, লেখা থেকে দূরে থাকলেই ভালো। তার পর আবার সম্পাদকের তাড়া খেয়ে লিখতে হয়। বিরতি এমনিই নিই। কোনও তাগিদ থেকে নয়। কুঁড়েমির জন্য।’

    প্রচেতরও মত, ‘বিরতি থাকা জরুরি। আমি এমনিই খুব কম লিখি। এখন দেখি, অনেকে বছরে চার-পাঁচটা উপন্যাস লিখে ফেলছেন। আমার ভালো লাগে। ওঁরা পারছেন। কিন্তু আমি পারছি না। আমি বছরে একটার বেশি উপন্যাস লিখতে পারি না। গল্পও খুব বেশি লিখে উঠতে পারি না। বছরে হয়তো দশটা। মাসে একটা। বিরতি দরকার। লেখকের মাঝে মাঝে আটকে যাওয়া দরকার। লেখকেরও নিজেকে আটকে দেওয়া দরকার।’

    উপন্যাসের চেয়ে গল্প লিখতেই বেশি পছন্দ করেন প্রচেত। তাঁর কথায়: ‘গল্প আমার কাছে অনেক তীব্র। অনেক তীক্ষ্ণ। অনেক আনন্দদায়ক এবং অনেক যন্ত্রণাদায়ক একই সঙ্গে। যেটুকু আসে, সূচের ফলার মতোই আসে। বৃষ্টির ফোঁটা গায়ে পড়লে যে আনন্দ হয়, তার সঙ্গে কিন্তু পুকুরে ডুব দেওয়ার আনন্দ মেলালে চলে না। দুটো এক নয়। আমি অনেক জায়গায় লিখেওছি, আমি যখন গল্প লিখতে বসি, মনে হয় যেন আমি গল্পের সঙ্গে দাবা খেলছি।’

    আর কবিতা? যখন কেউ ভালো লাগা প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, ‘একেবারে কবিতার মতো’, সেই প্রশংসা কি ভালো লাগে প্রচেতর? গল্পকারের উত্তর, ‘কবিতার মতো সুন্দর, এই কথাটা বহু দিন ধরেই প্রচলিত। এটা এখন একটা লব্জ হয়ে গিয়েছে। আমি কিন্তু কবিতা লিখি না। একদিনও লিখিনি। কিন্তু এটা যখন কেউ বলেন, আমি কিন্তু গর্বিত হই। কবিতার মতো বলা মানে গদ্যকে খাটো করা নয়। কবিতার সৌন্দর্য বোঝাতে আমরা কবিতার মতো বলি। এটাকে আক্ষরিক অর্থে দেখলে হবে না। অর্থগত ভাবে দেখতে হবে।’

    তবে এই ধরনের লব্জের মধ্যে এক ধরনের ফাঁকিবাজিও আছে বলে মত উল্লাসের। তাঁর কথায়, ‘আমার একটা অভিজ্ঞতা রয়েছে। একদল মননশীল পাঠক বা দর্শক তো রয়েছেন, যাঁরা কবিতার ভাব বোঝেন, তাই বলেন ‘কবিতার মতো’। কিন্তু বাংলা সাহিত্যে কতগুলো শব্দবন্ধ লব্জ হয়ে গিয়েছে। আমি যদি সিনেমা দেখে কিছুই না বুঝে বলে দিই, ‘কবিতার মতো’, তা হলে আমার সাত খুন মাফ! এর মধ্যে একটা ফাঁকিবাজিও আছে। হয়তো কিছু বুঝলই না, অথচ বলে দিল, ‘আমার ভিতরটা নড়ে গেল’, ‘আমাকে কে যেন ধাক্কা দিয়ে গেল’ কিংবা আমি স্তব্ধ হয়ে বসে আছি।’

    প্রচেতর গল্প-উপন্যাসে যেমন ‘অ্যাবসার্ডিটি’র ছোঁয়া থাকে, তেমনই উল্লাসের লেখায় থাকে হাস্যরস। কিন্তু তাঁর মন যদি কোনও কারণে বিরক্ত, ক্রুদ্ধ বা ভঙ্গুর হয় কিংবা হাসি দূরদূরান্তেও নেই, তখন কি হাসির গল্প লেখা যায়? জবাবে কথাকার বললেন, ‘আমি সব সময়ে হাসিঠাট্টার মধ্যে থাকতেই ভালোবাসি। ফলে সেটা অসুবিধা হয় না। যদি কখনও দুঃখজনক ঘটনা ঘটেও, তখন ওটা মন থেকে সরিয়ে ফেলতে হয়। আর এটা অভ্যাসেরও ব্যাপার। দীর্ঘ দিন লিখতে লিখতে এটা হয়ে যায়।’

    সঙ্গত করে প্রচেতও বললেন, ‘লেখায় হাস্যরস বা রসবোধ থাকলে, তার ভিতরে অন্য একটা দিকও থাকে। অনেক সময়ে সূক্ষ্ম বেদনাও থাকে। সমাজের কঠিন অবিচার থাকে। নির্যাতন, অপমান থাকে। প্রতিবাদ থাকে। এই জন্যই উল্লাস অনেক বড় সাহিত্যিক। কারণ ওঁর লেখায় যে হাস্যরস, কৌতুকরস, শ্লেষ, ব্যঙ্গ থাকে, তার তলায় অনেক বেদনা, প্রতিবাদ, প্রবঞ্চনা, এবং ভালোবাসাও গোপন থাকে। সেই জন্যই তা সাহিত্যপূর্ণ হয়। সেখানে ছ্যাবলামি নেই। হাসি মানেই সেটা ভালো হবে, এমন ভাবার কোনও কারণ নেই। হাসির মধ্যে স্থূলতা থাকতে পারে। আবার সূক্ষ্ম বোধের হাসিও হতে পারে। এই সময়ের অন্যতম রসবোধসম্পন্ন লেখক উল্লাস।’ প্রচেতর বাক্য শেষ করলেন উল্লাস। বললেন, ‘হাসিটা শেষ হওয়ার আগেই আমাদের দু’ফোঁটা চোখের জল পড়ে যায়!’

  • Link to this news (এই সময়)