‘সুই ধাগা’ সিনেমার মৌজি আর মমতার কথা মনে আছে? সিনেমায় দেখা গিয়েছিল, সাধারণ এক দম্পতি কী ভাবে নিজেদের দক্ষতায় স্বনির্ভর হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল। পশ্চিম মেদিনীপুরের বেলদা ক্লাবের উদ্যোগে সোমবার রাতে আয়োজন করা হয়েছিল ১২ জোড়া দম্পতির গণবিবাহ। মৌজি ও মমতার মতো তাঁদের পথটা একটু মসৃণ করে দেওয়ার চেষ্টা করলেন অনেকে। এ দিনের বিয়ের আসরে বিশেষ চমক ছিল মহিলা পুরোহিত। চমক ছিল বিয়ের উপহারেও। সাধারণ ঘরসজ্জার জিনিসের পাশাপাশি প্রত্যেক নববধূর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে একটি করে সেলাই মেশিন। বিয়ের পিঁড়ি থেকেই শুরু হলো স্বনির্ভরতার লড়াই। বলিউডের পর্দার মমতার মতোই এই মেয়েরাও স্বনির্ভর হয়ে সাজাতে পারবেন নতুন সংসার।
যে পাত্রীদের ভাই নেই, তাঁদের জন্য বড় দাদার ভূমিকা পালন করেছেন বেলদা ক্লাবের সদস্যরাই। পিঁড়ি ধরা থেকে শুরু করে কন্যাদানের কাজ— হাসিমুখে সব দায়িত্ব সামলেছেন তাঁরা। বিয়ের উপঢৌকন হিসেবে খাট, আলমারি, আলনা এবং রান্নার যাবতীয় সরঞ্জামে সাজিয়ে দেওয়া হয়েছে তাঁদের নতুন জীবনের পথ। আর এই সবের ভিড়ে সেলাই মেশিন যেন এক আশীর্বাদ, যা তাঁদের আর্থিক স্বাধীনতার পথ দেখাবে।
বেলদার এই গণবিবাহের অন্যতম আকর্ষণ মহিলা পুরোহিত। খড়্গপুরের তালবাগিচার শুভ পরিণয় মহিলা পুরোহিত গোষ্ঠী এ দিন গণবিবাহ দিয়েছেন। মন্ত্রোচ্চারণ থেকে লৌকিক আচার— সবটাই সামলেছেন মহিলা পুরোহিতরা। সাধারণত স্বামী তাঁর স্ত্রীর সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে দেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বৈদিক নিয়ম মেনে স্ত্রীও তাঁর স্বামীর কপালে সিঁদুরের তিলক পরিয়ে সমান সম্মানের বার্তা দিয়েছেন। পারিবারিক বন্ধনের এই আবেগঘন মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে রইল গোটা বেলদা।
মহিলা পুরোহিত নন্দিনী ভৌমিক অত্যন্ত সাধুবাদ জানিয়েছেন বিষয়টির। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই মহিলা পুরোহিতের ধারা দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ুক। কিন্তু তাঁরা যেন পুরো বিষয়টি জেনে তবেই এই কাজ করেন। শুধুমাত্র গান করাই আমাদের কাজ নয়। সংস্কৃত ভাষায় সঠিক মন্ত্রোচ্চারণ এবং পুরো বিষয়টির মানে বুঝে তবেই এই কাজ করা উচিত।’
প্রাক্তন অধ্যাপিকা এবং সমাজকর্মী শাশ্বতী ঘোষ বলেন, ‘বেলদার এই উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসার যোগ্য। বাঙালি বিয়েতে সাধারণ ঘরকন্নার জিনিস দেওয়া হয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে নতুন কনের কথা ভেবে নব দম্পতির কথা ভেবে সেলাই মেশিন দেওয়া হয়েছে। বর্তমান যুগে বেশির ভাগ মেয়েরাই স্বনির্ভর হতে। সে জন্যে তাঁরা নানা রকম কাজেও যুক্ত হচ্ছেন। এমনকি অনেকে স্বনির্ভর হতে পরিযায়ী শ্রমিকের পেশাও বেছে নিচ্ছেন।’
বেলদা ক্লাবের এই উদ্যোগকে কুর্নিশ জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা সকলেই। এ দিন বিয়ের পর পাত্র পক্ষ ও কন্যাপক্ষের জন্য ছিল এলাহি প্রীতিভোজের আয়োজন। বেলদা ক্লাবের এই মানবিক প্রচেষ্টা প্রমাণ করে দিল যে, অন্ধ বিশ্বাস থেকে সমাজকে সরিয়ে এক সুতোয় গেঁথে দেওয়া যায় হাজার হাজার মানুষের স্বপ্ন।
বেলদা ক্লাবের সভাপতি সুজিতকুমার চক্রবর্তী বলেন, ‘আমরা প্রায় ১৪ বছর ধরে গণবিবাহ দিচ্ছি। চলতি বছরে আমরা ১২ জন দম্পতির বিয়ে দিয়েছি। এ দিন কলকাতা থেকেই এক যুগল গণবিবাহের আসরে যোগ দিয়েছেন। আমরা আইনি এবং সামাজিক দুই ভাবেই বিয়ে দিয়েছি।’