কমল মেলার মণ্ডপ থেকে সরল রামসীতার মূর্তি, ক্ষুব্ধ দুর্গাপুরবাসী
বর্তমান | ২৮ জানুয়ারি ২০২৬
নিজস্ব প্রতিনিধি, দুর্গাপুর: বিজেপি কর্মকর্তাদের আয়োজিত কমল মেলাতেই রামসীতার চূড়ান্ত অবমাননার সাক্ষী থাকল দুর্গাপুর। মঙ্গলবার দুর্গাপুর রাজীব গান্ধী ময়দানে কমল মেলার উদ্বোধন করেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নীতির নবীন। সকালে সেই মেলা প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা যায়, মূল মঞ্চের পাশেই রাম মন্দিরের আদলে প্যান্ডেল করা হয়েছে। সেখানে রাম ও সীতার বিগ্রহ রাখা হয়েছে। তাঁদের পাশে রয়েছেন লক্ষ্মণ আর রামচন্দ্রের পদতলে জোড়হাতে বজরংবলী হনুমানজি। বেলা বাড়তে মণ্ডপ থেকে প্রথমে রামসীতা ও লক্ষ্মণের মূর্তি পিছনে সরিয়ে দেওয়া হয়। সামনে স্থান দেওয়া হয় ভারত মাতার মূর্তি। সন্ধ্যায় দেখা যায় মণ্ডপ থেকে রামসীতা, লক্ষ্ণণ ও হনুমানজির মূর্তি সরিয়ে ফেলা হয়েছে। এই মণ্ডপে ভারত মাতার পায়ে পুষ্প অর্ঘ্য দিয়ে মূল মঞ্চে ওঠেন নীতির নবীন। সেখানে মা দুর্গার কথা উল্লেখ করলেও নীতির নবীনের মুখে একবারও রামসীতার কথা উঠে আসেনি। তাঁর এই কর্মকাণ্ড দেখে অনেকেই স্তম্ভিত।এদিনের অনুষ্ঠান মঞ্চে কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য রাখেননি নীতিন নবীন। তুলে ধরতে চেয়েছিলেন বাংলার সংস্কৃতিকে। সেখানেও তাঁকে হোচট খেতে দেখা যায়। অন্যান্য অবাঙালি নেতাদের মতো বাংলায় এসে বাংলায় মন্তব্য করার চেষ্টা করেন তিনি। করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘বঙ্গভুমিকে আমি প্রণাম করিছে।’ রাজা রামমোহন রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কথা স্মরণ করলেও তাদের কীর্তি সবিস্তারে তুলে ধরতে যাননি। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কীর্তি তুলে ধরতে গিয়েই ফের হোঁচট খান সর্বভারতীয় সভাপতি। কবিগুরুর প্রতিষ্ঠিত আশ্রম শান্তিনিকেতনকে তিনি শান্তিনিকেতন সংস্থা বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, কবিগুরুর প্রতিষ্ঠিত শান্তিনিকেতন সংস্থা ভারতীয় সংস্কৃতিকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরতে বড় ভূমিকা নিয়েছিল। যদিও নব নিযুক্ত বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতির এইসব ভুলত্রুটিকে ছাপিয়ে গেল রামচন্দ্র ও মা সীতার নির্বাসন।এদিন মেলার চারিপাশে কেন্দ্রীয় সরকার বাংলার জন্য কী করেছে, তা তুলে ধরার চেষ্টা হয়। সেখানে দুর্গাপুজো ও শান্তিনিকেতনকে দেওয়া ইউনেসকোর স্বীকৃতির কৃতিত্ব বিজেপির বলে দাবি করেন নীতিন। কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলি তুলে ধরার পাশাপাশি মূল মঞ্চের সামনে রাম মন্দিরের আদলে থাকা মণ্ডপ দেখে অনেকেই ভেবেছিলেন, বিজেপির আমলে তৈরি হওয়া অযোধ্যার রাম মন্দিরকে তুলে ধরতে চাইছে তারা। সেই মণ্ডপ থেকে স্বয়ং রামচন্দ্রের বিতারণ নতুন শোরগোল ফেলেছে। অনেকের মতে বাংলার রাজনীতিতে রামচন্দ্রকে আগে কোনো দলই টেনে আনেন। কিন্তু বাংলা সংস্কৃতির সঙ্গে অবশ্যই সীতা ও রামের মূর্তির যোগসূত্র রয়েছে। দুর্গাপুরের পাশাপাশি রাজ্যের বহু জায়গায় রামসীতার মন্দির রয়েছে। সাংস্কৃতিক উৎসবে কীভাবে বেমানান হয়ে গেলেন রাম-সীতা তা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। অনেকের মতে, অযোধ্যার রাম মন্দির গড়ে দেশব্যাপী ভোটের ফসল তোলার পরিকল্পনা ছিল বিজেপির। ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে কিন্তু খোদ অযোধ্যাতে মন্দির গড়ার সাফল্য ভোটবাক্সে পায়নি বিজেপি। তাই কি রামসীতা না পসন্দ, প্রশ্ন তুলেছে তৃণমূল।রাজ্যের পঞ্চায়েত আবাসন মন্ত্রী প্রদীপ মজুমদার বলেন, মা সীতা ও রামচন্দ্র আমাদের কাছে আরাধ্য দেবতা। বিজেপির কাছে তা ছিল পণ্য। ব্যবসায়ীর কোনো পণ্য বিক্রি না হলে তার যেমন গুরুত্ব থাকে না, বিজেপির কাছেও ঠিক তাই। বাংলা সংস্কৃতি রাম-রহিমকে নিয়ে চলে। এখানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি সবচেয়ে বড় শক্তি। রাজ্যের নেতারা বাংলা দখল করে শাসন করার স্বপ্ন দেখছে। এখন তারা মা দুর্গার কথা বলছেন। আমরা নিশ্চিত, ভোটে সাফল্য না পেলে তারা মা দুর্গাকেও দূরে সরিয়ে দিতে দু’ বার ভাববে না।অনুষ্ঠান স্থলে বিষয়টি নিয়ে জানতে চাওয়া হয় দুর্গাপুরে বিজেপির মুখপাত্র সুমন্ত মণ্ডলের কাছে। তিনি বলেন, বিষয়টি তাঁর নজরেই নেই। এনিয়ে কোনো মন্তব্য করতে পারবেন না।