‘ক্লান্ত ঘুমচোখ খুলেই দেখলাম দাউদাউ করে জ্বলছে গোটা ঘর’
বর্তমান | ২৮ জানুয়ারি ২০২৬
নিজস্ব প্রতিনিধি, তমলুক: টানা চার-পাঁচদিন নাইট ডিউটি করে ক্লান্ত ডেকরেটার্স সংস্থার শ্রমিকরা রাত সাড়ে ন’টার মধ্যেই শুয়ে পড়েছিলেন। ক্লান্তি এতটাই তাঁদের গ্রাস করেছিল যে, শুয়ে মোবাইল ঘাঁটার অবস্থাও ছিল না কারও। শোওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘুমের অতলে তলিয়ে যান সবাই। এমন সময়েই ‘আগুন আগুন’ চিৎকার। গত রবিবার রাতে দক্ষিণ ২৪ পরগনার নরেন্দ্রপুর থানার অধীন নাজিরাবাদে ডেকরেটর সংস্থার গোডাউন বিধ্বংসী আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। বহু শ্রমিক নিখোঁজ। ৮ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। আগুনের গ্রাস থেকে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার বাসিন্দা তিন শ্রমিক প্রাণে বেঁচে ফেরেন। তাঁরা হলেন, ময়নার বিষ্ণুপদ খুঁটিয়া, শহিদ মাতঙ্গিনী ব্লকের বিমল ভৌমিক ও তমলুকের সুশান্ত জানা। তাঁরা নিজেদের অভিজ্ঞতা জানিয়ে বলেছেন, চিৎকার শুনে আমাদের ঘুম ভাঙে। চারিদিক তখন ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। প্রাণ বাঁচাতে গেটের দিকে যাই। কিন্তু, সেই গেটের কাছেই লেলিহান শিখায় জ্বলছে আগুন। তখন গোডাউনের আরেকটি গেট দিয়ে কোনওরকমে বেরিয়ে আসি। কিন্তু, আগুনের তাপ চোখেমুখে লেগে বেহুঁশ হয়ে পড়ি। সেখান থেকে আমাদের এসএসকেএম হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রাথমিক চিকিৎসার পর ছেড়ে দেয়।অভিশপ্ত ওই ডেকরেটার্স সংস্থার মালিক পূর্ব মেদিনীপুর জেলার খেজুরির পূর্বচড়া গ্রামের গঙ্গাধর দাস। সেই সুবাদে সংস্থার অধিকাংশ কর্মীও এই জেলার। তাঁরা এজেন্টের মাধ্যমে ওই কারখানায় কাজ পেয়েছিলেন। মঙ্গলবার নিজের বাড়িতে বসে সুশান্ত জানা বলেন, ওই কারখানায় পূর্ব মেদিনীপুরের লোকজনই বেশি। আমাদের ঘরে প্রায় ১৬-১৭ জন ছিল। রাত ৯টা থেকে সাড়ে ৯টার মধ্যে আমরা খাওয়াদাওয়া সেরে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ একজন কাকু আমাদের ডাকাডাকি করেন। তিনি বলেন, আগুন লেগে গিয়েছে। আমি ফোনটা নিয়ে বিছানা থেকে উঠি। দেখি, চারিদিক ধোঁয়ায় ঢাকা। সকলেই ঘরের ভিতর ছিল। ওই কারখানায় মোট দু’টি গেট ছিল। একটা গেটে আগুন জ্বলছিল। ধোঁয়াচ্ছন্ন গোডাউনের অবশিষ্ট গেটের দিকে আমরা ছুটে যাই। সেখান দিয়ে বেরিয়ে পড়ি। গেটের দিকে এগনোর সময়ই আগুনের শিখা চোখে মুখে লেগে গিয়েছিল। নীচে আসার পরই আমাকে এসএসকেএম হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।কমলবাবু বলেন, সাক্ষাত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ফিরেছি। আগুনের গ্রাসে দম আটকে যাচ্ছিল। প্রাণে বাঁচার তাগিদে বাধ্য হয়েই বাকি সহকর্মীদের মৃত্যুর মুখে ফেলে আমাদের ছুটতে হয়েছে। না হলে আমরাও বাঁচতে পারতাম না। আমাদের ওই কারখানায় ফুলের কাজ হয়। ফুলের গোডাউন ছিল। কাঁচাফুল এবং আর্টিফিশিয়াল দু’রকম ফুলেরই কাজ হতো। সাধারণত আমরা রাত ১২টা থেকে ১টা পর্যন্ত ফোন ঘাঁটাঘাঁটি করি। কিন্তু, টানা নাইট ডিউটির ধকলে রবিবার রাতে আর ফোন নাড়াচাড়া করার ইচ্ছা কারও ছিল না। তাই সকলে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ি। ঘুমের মধ্যেই এমন যমদূতের আবির্ভাব হবে কেউ ভাবতেও পারেনি।