নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা: পূর্ব মেদিনীপুরের বাসিন্দা নিরঞ্জন মণ্ডলের ছেলে রামকৃষ্ণ এবং ভাই গোবিন্দ, রবিবার রাতে নাজিরাবাদে ডেকোরেটর্স সংস্থার গোডাউনেই ছিলেন। হন্যে হয়ে তাঁদের খুঁজছিলেন নিরঞ্জনবাবু। তমলুকের বাসিন্দা হরেকৃষ্ণ মাইতি কাঁধে ব্যাগ নিয়ে চলে এসেছিলেন গোডাউনের সামনে। নিজের ভাই আর খুড়তুতো ভাইয়ের খোঁজ পেতে। প্রশান্ত এসেছিলেন খেয়াদহ ২ গ্রাম পঞ্চায়েতে। ভাইরাভাইয়ের জন্য। দিনভর ‘নিঁখোজ’ কত? কার দেহাবশেষই বা পাওয়া গেল? কারা বেঁচে ফিরতে পারলেন? এই নিয়েই দিনভর চলল হিসেব নিকেশ।অভিশপ্ত গোডাউনের সামনে মঙ্গলবার হাতে ডায়েরি নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন এক পুলিশ আধিকারিক। হিসেব কষছেন কতজন নিখোঁজ, কতজন বাঁচতে পেরেছেন। কিন্তু পরিবারের মানুষের মন মানছে না। কেউ বলছেন, ‘দেহটা যেন পাই। সত্কার যেন করতে পারি।’ প্রিয়জন আর নেই, অনেকে আবার এখনই মেনে নিতে রাজি নন। দিনভর ঘুরে গোবিন্দ মণ্ডল-রামকৃষ্ণ মণ্ডলের কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। গোবিন্দর স্ত্রী ও ছেলে আছে। পড়াশোনা করিয়ে ছেলেকে ডাক্তার বানাতে গ্রাম ছেড়ে শহরে থাকতে শুরু করেন। হিন্দু স্কুলের ছাত্র তাঁর ছেলে। গোবিন্দর দেখা স্বপ্ন কীভাবে পূরণ হবে, সেটাই ভেবে পাচ্ছেন না বাড়ির লোকজন। রামকৃষ্ণ মণ্ডলের বিয়ের কথাবার্তা চলছিল। দুই বছরের মধ্যে বিয়ে করার কথা ছিল। নিরঞ্জনবাবু বলেন, দিন কয়েক আগে ছেলেকে ১০০ টাকা দিয়েছিলাম টিফিন খাওয়ার জন্য। এখানে ঠিক মত বেতন দিত না। বারণ করেছিলাম, এখানে কাজ করতে। টাকা পাচ্ছিল না বলেই টিফিনের টাকা পাঠিয়েছিলাম। এখন সেটাই বারে বারে আওড়ে যাচ্ছেন বাবা নিরঞ্জন। তমলুকের বাসিন্দা হরেকৃষ্ণ বলছিলেন, ‘পরদিন সকালেই বাড়ি যাওয়ার কথা ছিল। আমার ভাইয়ের নাম শ্রীকৃষ্ণ মাইতি আর খুড়তুতো ভাই বাপন মাঝি। পুলিশও তো কিছু বলছে না।’ খেয়াদহ ২ পঞ্চায়েত অফিসে এসে প্রশান্ত বলছিলেন, ‘আমার ভায়রাভাই বাসুদেব হালদার ওখানে কাজ করেন। ৭-৮ বছর ধরে কাজ করছেন। স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ছেলে সবাই প্রতীক্ষা করছে। দেহটা যেন পাই।’নাজিরাবাদের গোডাউনের সামনেই রয়েছে কয়েকটি চায়ের দোকান, ভাতের হোটেল। যে চায়ের দোকানে এসে বসতেন, আড্ডা মারতেন, খাওয়া-দাওয়া করতেন ‘নিখোঁজ’ কর্মী-শ্রমিকরা। মঙ্গলবার দমকল-পুলিশ-সাংবাদিকদের ভিড়ে সেসব চায়ের দোকান খালি নেই ঠিকই। কিন্তু চা দোকানির স্মৃতিচারণায় এদিন বারবার ফিরে এলেন হতভাগ্য শ্রমিক-কর্মীরা। চা দোকানির নাম রায়পদ মণ্ডল। বলছিলেন, ‘রবিবার রাতে দেখলাম একটা ম্যাটাডর ভর্তি করে অনেকে ফিরে গেলেন। এখানে তো শিফটে কাজ হতো। সব মিলিয়ে শয়ে-শয়ে লোক এখানে আসতেন। আমার দোকানে অনেকেই আসতেন। সবার মুখ চিনি, অনেকের সঙ্গে গল্পগুজবও হত। যা হল, সেই পরিচিত মুখগুলোর সঙ্গে আর দেখা হবে কি না, কে জানে!’ -নিজস্ব চিত্র