• আনন্দপুর কাণ্ড: রাতের পর রাত দাহ্য পদার্থের সঙ্গেই ঘুমোন শ্রমিক-কর্মীরা
    বর্তমান | ২৮ জানুয়ারি ২০২৬
  • সোহম কর, কলকাতা: থানা নরেন্দ্রপুর, সোনারপুর উত্তর বিধানসভা। পিন কোড কলকাতা ৭০০১৫০। কিন্তু পঞ্চায়েত এলাকা। আবার দক্ষিণ শহরতলির ল্যান্ডমার্ক, ভিভিআইপি মানুষজনের বসবাসস্থল ‘আরবানা’ থেকে মাত্র কয়েক মিনিটের দূরত্বে এই বহুল চর্চিত নাজিরাবাদ। সেখানে রয়েছে নামজাদা এক ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ। একটি কলেজ, কয়েকটি বাড়ি, ছোট ছোট দোকান আর অনেকগুলো গুদাম-ওয়ার্কশপ নিয়ে এই নাজিরাবাদ।এলাকায় প্রবেশ করলেই দেখা যায় বিশালাকার নীল রঙের অ্যাসবেস্টাসে ঢাকা গুদাম। তার মাঝখান দিয়ে বাঁধানো রাস্তা। ইতিউতি হলুদ হেলমেট পরে বিবর্ণ জামাকাপড়ে মানুষজন ঘুরে বেরাচ্ছেন। ওই এলাকাতেই এমনই জোড়া গোডাউন আগুনে ভষ্মীভূত। এখন কর্মীদের দেহাবশেষ উদ্ধারের কাজ চলছে। যা দেখতে দফায় দফায় স্থানীয়রা ভিড় করছেন। কিছু জিজ্ঞাসা করলে তাঁদের সবার ‘কমন’ উত্তর— ‘আমরা কিছু জানি না। দেখতে এসেছি মাত্র।’ ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসেছিলেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার ও যুব কংগ্রেস নেতা আশুতোষ চট্টোপাধ্যায়ও।মঙ্গলবার দুপুরে পুড়ে যাওয়া গোডাউন তখনও ধোঁয়ায় ঢাকা। দমকল কর্মীরা কাজ করছেন। হাওয়ায় ছাই উড়ছে আকাশে। ওই গোডাউনের অদূরে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ। পড়ুয়ারা আসছেন। সেই কলেজকে ঘিরে অনলাইন কোম্পানি, নামী ফুড চেইন কোম্পানি, নামজাদা দু’চাকা-চার চাকার ওয়ার্কশপ, ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী ও আসবাবপত্রের স্ট্যাক ইয়ার্ড। সব ক’টিতেই অবশ্য অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম রয়েছে। সেখানকার আধিকারিকরা নাম না বলে মুখ খুলেছেন। এক গাড়ি কোম্পানির কর্মীর কথায়, ‘এখানে রাতে পাঁচজন থাকেন।’ থাকেন ইঞ্জিন তেলের মতো দাহ্য বস্তুর সঙ্গে। আতঙ্ক তো আছেই।’ আর এক কোম্পানির আধিকারিক বলছিলেন, ‘আমাদের এখানে একজন রাতে থাকেন। কিন্তু আমরা পেট্রল-ডিজেল রাখি না। যতটা সুরক্ষা নেওয়া যায়, নিয়ে থাকি।’ আবার এক খাবারের গুদামের আধিকারিক বলছিলেন, ‘আমাদের এখানে রান্নাঘর নেই। কিন্তু পাশের কেউ যদি রান্না করে, আমরা কী বলতে পারি? এরপর ভয় তো লাগছেই। সামনেই যে কলেজ।’ সেখানকার পড়ুয়ারা বলছেন, ‘এরকম ঘটনা শোনার পর ভয় তো লাগারই কথা।’ ওই এলাকাতেই এক ঝুপড়ির বাসিন্দা বলছিলেন, ‘এখানে তো আগে ধানজমি ছিল। কিছু জলা জমিও দেখেছি ছোটবেলায়। হঠাত্ই দেখলাম, চারপাশে এতগুলো গুদাম তৈরি হয়ে গেল।’ এইসব গুদামের মাঝখানে আবর্জনার স্তূপ। সেখান থেকে দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। তার মধ্যেই গজিয়ে উঠেছে ছোট ছোট চায়ের দোকান, ভাতের হোটেল। সেই সব দোকানি বলছিলেন, ‘এখানকার শ্রমিক-কর্মীদের জন্যই আমাদের দোকানপাট চলে। এখন আর কেউ আসবে কি না, কে জানে!’আগুনের লেলিহান শিখা থেকে তাঁরা সহস্র যোজন দূরে! তবুও স্রেফ নাজিরাবাদ নামটা ‘অভিশপ্ত’ হয়ে ওঠায়, সেইসব শ্রমিক-কর্মীদের কাছেও বাড়ি থেকে ফোন আসছে। উদ্বেগের সঙ্গে পরিবারের প্রশ্ন একটাই, ‘তুমি ঠিক আছ তো? তোমার অফিস ওখানে নয় তো?’ অভয়ের উত্তর যাচ্ছে এপার থেকে, ‘ওসব অনেক দূরে। আমরাঠিক আছি।’  নিজস্ব চিত্র
  • Link to this news (বর্তমান)