• কঙ্কালসার দেহ উদ্ধার, পোড়া গন্ধে শুধুই উদ্বেগ
    এই সময় | ২৮ জানুয়ারি ২০২৬
  • এই সময়: মরে আসা শীতের হাওয়ায় ছাইয়েই ওড়াউড়ি। কালো-ধূসর রঙের ছাই সরতেই বেরিয়ে আসছে হাড়গোড়। টুকরো টুকরো। পুড়ে গিয়েছে সব…

    ৪৮ ঘণ্টা পেরিয়ে গিয়েছে। আনন্দপুরের একটি ডেকরেটর সংস্থার গোডাউন এবং একটি নামজাদা মোমো সংস্থার কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ঝলসে মৃতের সংখ্যা ঠিক কত, তা ঠাহরই করা যাচ্ছে না। মঙ্গলবার পর্যন্ত আট জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা গিয়েছে। তবে তাঁদের পরিচয় স্পষ্ট করে জানা সম্ভব হয়নি। ওই জতুগৃহ যে অবস্থায় দেহগুলি উদ্ধার করা হয়েছে, তাতে চিহ্নিত করা প্রায় অসম্ভব। শুধুই কঙ্কাল! নিখোঁজ ডায়েরি হয়েছে ১৩ জনের নামে। আরও অন্তত ২০ জনের পরিজনেরা উদ্বিগ্ন। তাঁদেরও খোঁজ মিলছে না। কিন্তু মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত এই জনাকুড়ির নামে কোনও মিসিং ডায়েরি করেননি তাঁদের পরিবারের লোকেরা। ইতিমধ্যেই মৃতদের পরিবারকে ১০ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছে রাজ্য সরকার।

    রবিবার গভীর রাতে নরেন্দ্রপুর থানার খেয়াদহ দু’নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় ওই বিখ্যাত মোমো প্রস্তুতকারী ফুড চেনের কারখানা এবং একটি ডেকরেটর সংস্থার গুদামে ভয়াবহ আগুন লাগে। পুলিশ এবং দমকল সূত্রের খবর, রাতে ডেকরেটর সংস্থার অন্তত ৩০ জন কর্মী গোডাউনে পিকনিক করেছিলেন। কাঠ এবং প্লাইউড জ্বেলে রান্না হয়। গভীর রাতে খাওয়াদাওয়ার পরে গুদামের ভিতরেই সকলে ঘুমিয়ে পড়েন। পুলিশ এবং দমকলের অনুমান, সে সময়ে মোমো কারখানাতেও বেশ কয়েক জন ছিলেন। গুদাম এবং কারখানার মূল গেট বাইরে থেকে তালাবন্ধ ছিল বলে প্রাথমিক ভাবে জানা গিয়েছে। ফলে দু’টি জায়গাই জতুগৃহে পরিণত হয়েছিল।

    স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে। রাত আড়াইটে নাগাদ আগুন লাগে ডেকরেটর সংস্থার গোডাউনে। পাঁচ জন কোনওক্রমে পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যান। কিন্তু বাকিরা আর পারেননি। গোডাউন এবং কারখানায় বিপুল পরিমাণে নানা ধরনের দাহ্য পদার্থ ছিল। ফলে বন্ধ ঘরে বিষাক্ত গ্যাসে দম বন্ধ হয়ে আগুনের সামনে স্রেফ অসহায় ভাবে আত্মসমর্পণ করতে হয়েছে আটকে পড়া মানুষগুলোকে। পালানোর ন্যূনতম সুযোগটুকুও হয়তো পাননি অনেকে। নিখোঁজদের তালিকায় মোমো সংস্থার তিন জন কর্মী রয়েছেন বলে জানা গিয়েছে।

    মঙ্গলবার সকালেও ধিকিধিকি আগুন জ্বলেছে ধ্বংসস্তূপে। ঘটনাস্থল কর্ডন করে দিয়েছে পুলিশ। আগুনে খাক হয়ে যাওয়া কারখানা ও গুদামের দিকে তাকে কারও হাহাকার, কারও অনন্ত উদ্বেগ মিশে যাচ্ছে পোড়া গন্ধে। কেউ খুঁজছেন ভাইকে, কারও স্বামী, কারও বাবা — ওই ছাইয়ের স্তূপে কে মিশে আছেন, কেউ জানেন না।

    ইএম বাইপাস লাগোয়া আনন্দপুরের ঠিক পিছনে এই এলাকায় একাধিক সংস্থার গুদাম ও কারখানা রয়েছে। রবিবার আগুন লাগার পরে বিস্ফোরণের শব্দও পাওয়া গিয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। দমকলের ১২টি ইঞ্জিন আগুন নেভাতে পৌঁছলেও সরু রাস্তা, ঘনবসতির কারণে ঘটনাস্থলে পৌঁছতে সমস্যায় পড়ে ইঞ্জিনগুলি।

    ঘটনাস্থলে যান মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস, সাংসদ সায়নী ঘোষ, স্থানীয় বিধায়ক ফিরদৌসী বেগম এবং বিজেপি বিধায়ক অশোক দিন্দা। জানা গিয়েছে ডেকরেটর সংস্থা এবং মোমো তৈরির কারখানায় যাঁরা কাজ করতেন, তাঁরা মূলত পূর্ব মেদিনীপুরের এগরা, কাঁথি ও হলদিয়ার বাসিন্দা। বারুইপুর পুলিশ জেলার এসপি শুভেন্দ্র কুমার বলেন, ‘সরকারি ভাবে এখনও পর্যন্ত তিন জনের দেহ উদ্ধার হয়েছে। এ ছাড়া উদ্ধার হয়েছে একাধিক দেহাংশ। মৃতদের পরিচয় জানা যায়নি। ডিএনএ টেস্ট করে পরিচয় জানা যাবে। নিখোঁজের সংখ্যা নিয়ে এখনও স্পষ্ট চিত্র নেই প্রশাসনের কাছে। মঙ্গলবার সন্ধে পর্যন্ত নরেন্দ্রপুর থানায় মোট ১৩টি নিখোঁজ ডায়েরি হয়েছে।’

    ডেকরেটর সংস্থার গুদামের গঙ্গাধর দাসের দাবি, ‘আগুন পাশের মোমো কারখানা থেকেই ছড়িয়েছে। ওখানে অবৈধ ভাবে সফ্ট ড্রিঙ্কস তৈরির কাজ চলত এবং দাহ্য পদার্থ মজুত ছিল।’ মোমো কারখানার তরফে পাল্টা অভিযোগ উঠেছে। গঙ্গাধরকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। এ দিন ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে দমকলমন্ত্রী সুজিত বসু বলেন, ‘প্রায় ৩৫ হাজার বর্গফুটেরও বেশি জায়গা জুড়ে এই গুদাম ও কারখানা। দাহ্য সামগ্রীতে ভরা ওই এলাকা মুহূর্তে আগুনের গ্রাসে চলে যায়। কোথাও কোনও অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নজরে আসেনি। বৈধ অনুমতি নিয়ে এগুলি তৈরি হয়েছিল কি না, ফায়ার অডিট হয়েছিল কি না — সব কিছুই খতিয়ে দেখা হবে। বেআইনি কিছু ধরা পড়লে কড়া ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।’ মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস বলেন, ‘নিখোঁজ বলে যাঁদের দাবি করা হচ্ছে, তাঁদের নামের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। সংখ্যার বিষয়ে কিছুটা মতভেদ রয়েছে।’

  • Link to this news (এই সময়)