• আজ সিঙ্গুরে মমতা, চড়ছে প্রত্যাশার পারদ, ফিরবে জমির হাল?
    এই সময় | ২৮ জানুয়ারি ২০২৬
  • প্রদীপ চক্রবর্তী, সিঙ্গুর

    প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সভা করে যাওয়ার ১০ দিনের মাথায়, আজ বুধবার সিঙ্গুরে আসছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিধানসভা ভোটের আগে সিঙ্গুরের ইন্দ্রখালিতে মুখ্যমন্ত্রীর এই সভাকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলে তুমুল আগ্রহ তৈরি হয়েছে। কয়েক দিন আগেই সিঙ্গুর থেকে একাধিক সরকারি প্রকল্পের শিলান্যাস করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি আসার আগেই রাজ্য বিজেপি নেতারা ঘোষণা করেছিলেন, সিঙ্গুরে নতুন করে শিল্প স্থাপনের জন্য বার্তা দিতে পারেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটা না হওয়ায় নিরাশ হয়েছেন অনেকেই। চরম অস্বস্তির মুখে পড়েছেন এ রাজ্যের বিজেপি নেতারা। এই অবস্থায় মুখ্যমন্ত্রী আজ সিঙ্গুর থেকে কী বার্তা দেন, সেই দিকে তাকিয়ে রয়েছেন সবাই।

    সূত্রের খবর, সিঙ্গুরের বারুইপাড়া পলতাগর গ্রাম পঞ্চায়েতের ইন্দ্রখালি থেকে মুখ্যমন্ত্রী 'বাংলার বাড়ি' প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ে সরকারি সহায়তা তুলে দেবেন। তার পাশাপাশি একটি রাজনৈতিক জনসভাও করবেন তিনি। সিঙ্গুরের গোপালনগরে মোদী যেখানে সভা করেছিলেন, সেখান থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে ইন্দ্রখালিতে দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ের ধারে হচ্ছে মমতার সভা। পাশেই তৈরি হয়েছে হেলিপ্যাড। যদিও মুখ্যমন্ত্রী সিঙ্গুরে আসবেন সড়ক পথে। দুপুর ১২টা নাগাদ তাঁর সিঙ্গুরে পৌঁছানোর কথা। সভা শেষ করে হেলিকপ্টারে তিনি দমদম বিমানবন্দরে উড়ে যাবেন। মঙ্গলবার দুপুরে সেখানে গিয়ে দেখা গেল, মুখ্যমন্ত্রীর সভামঞ্চ তৈরির কাজ প্রায় সম্পূর্ণ। তাঁকে স্বাগত জানাতে দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়েতে তৈরি হয়েছে বড় বড় তোরণ। রাস্তার দু'পাশে তৃণমূলের পতাকায় মুড়ে দেওয়া হয়েছে।

    তৃণমূল সূত্রের খবর, জের ১৮টি ব্লক ও টাউন মিলয়ে মুখ্যমন্ত্রীর সভায় প্রায় দু'লক্ষ লোক জমায়েত করার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। ট্রাক, বাস, ম্যাটাডোর ছাড়া যাঁরা ট্রেনে করে আসবেন, তাঁদের জন্য সিঙ্গুর থেকে টোটোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। মঙ্গলবার মাঠ পরিদর্শনে আসেন রাজ্যের মন্ত্রী তথা সিঙ্গুরের বিধায়ক বেচারাম মান্না, শ্রীরামপুর সাংগঠনিক জেলার তৃণমূলের সভাপতি অরিন্দম গুঁই, বিধায়ক তপন দাশগুপ্ত ও জেলা পরিষদের সভাধিপতি রঞ্জন ধারা ও মেন্টর সুবীর মুখোপাধ্যায়। মুখ্যমন্ত্রীর আগমনে নতুন করে আশার আলো দেখছেন সিঙ্গুরবাসী।

    সিঙ্গুরের অনিচ্ছুক কৃষক ভরত সাহানা বলেন, 'আমরা ঊর্বর কৃষিজমি দখলের প্রতিবাদে আন্দোলন করেছিলাম। জমি ফিরে পেয়েছি। সেখানে এখন চাষ করছি। তৃণমূল নেত্রীর জন্যই সেটা সম্ভব হয়েছে। আমরা যেমন সেই ঋণ কখনও অস্বীকার করি না, উনিও কোনও দিন সিঙ্গুরকে ভুলতে পারবেন না।' তবে অনেকেই আছেন, যাঁরা জমি ফিরে পেলেও এখনও চাষ করতে পারছেন না। কারও আবার জমির কাগজপত্র নিয়ে সমস্যা আছে। তাঁদেরই একজন শিবু মালিক। তিনি বলেন, 'সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে জমি ফিরে পেলেও উচু-নীচু জমি হওয়ায় দাগ ও খতিয়ান নম্বর নিয়ে সমস্যা আছে। ভূমি ও ভূমি দপ্তরের ঢিলেমির জন্য ১০ বছরেও নথিপত্র ঠিক হলো না। তারপরেও দিদিই আমাদের ভরসা। উনি নিশ্চয় এই সমস্যা মেটানোর ব্যবস্থা করবেন।'

    শিল্পের জন্য জমি দিয়ে ছিলেন স্বরূপ দাস। তিনি বলেন, 'বিজেপির নেতারা শিল্পের কথা বলায় আমরা নতুন খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু নরেন্দ্র মোদী আমাদের হতাশ করেছেন। মুখ্যমন্ত্রী শিল্প নিয়ে নতুন কিছু করবেন, সেই ভরসা ও বিশ্বাস কোনওটাই নেই।' ইচ্ছুক কৃষক পরিবারের সন্তান পুলকেশ দাস বলেন, 'যিনি আমাদের ভবিষ্যত অন্ধকার করেছেন, তিনি কতটা আলো দেখাবেন, সেটা নিয়ে আমাদের সংশয় আছে।' সিঙ্গুর বন্ধ্যা জমি পুনরুদ্ধার কমিটির নেতা দুধকুমার ধাড়া বলেন, 'সিঙ্গুর নিয়ে রাজনীতির জেরে রাজ্যে পালাবদল হয়েছে। জমি ফেরতের ১০ বছর পরেও রাজনীতি হচ্ছে। আমরা চাই নেত্রী নিজে এসে সিঙ্গুরকে নিজের চোখে একবার দেখুক। তা হলেই সব পরিষ্কার হয়ে যাবে।'

    সিঙ্গুর জমি আন্দোলনের নেতা মহাদেব দাস বলেন, 'নিজেদের আখের গোছাতে জমির চরিত্র নিয়ে দলের একাংশ মুখ্যমন্ত্রীকে ভুল বুঝিয়েছেন। আমরা বাকি জমির সমস্যার কথা মুখ্যমন্ত্রীর গোচরে এনেছি। সিঙ্গুর থেকে মুখ্যমন্ত্রীর রাজনৈতিক জীবনের উত্থান হয়েছে। আমরা আশাবাদী, তিনি এই সমস্যার এই সময় স্থায়ী সমাধান করবেন। বিজেপির রাজ্য সম্পাদক দীপাঞ্জন গুহ বলেন, মুখ্যমন্ত্রী সিঙ্গুরে পাল্টা সভা করতে আসছেন। তাঁর শিল্প মানেই চপ শিল্প। তবুও আমরা চাইব, বিবাদ মিটিয়ে সিঙ্গুরে সত্যিকারের শিল্প নিয়ে আসুন।'

    সিঙ্গুর শিল্প বিকাশ উন্নয়ন কমিটির সভাপতি উদয়ন দাস বলেন, 'বিজেপি-তৃণমূল উভয়েই সিঙ্গুরে শিল্পের সম্ভাবনা ধ্বংস করার জন্য সমানভাবে দায়ী। এখন ভোটের মুখে উভয়েই নাটক করছে। কেউ-ই কিছু করবে না।' বেচারাম মান্না বলেন, সিঙ্গুরে প্রধানমন্ত্রী এসে প্রতারণা করেছেন। মিথ্যে ভাষণ দিয়েছন। সেখানে মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যের উন্নয়নের বার্তা দেবেন। বিধানসভা ভোটের আগে এটাই মুখ্যমন্ত্রীর প্রথম মিনি ব্রিগেড সভা হবে।'

  • Link to this news (এই সময়)