• অভিমানে বাড়ি ছাড়া দেবাদিত্য নিখোঁজ আগুনে
    এই সময় | ২৮ জানুয়ারি ২০২৬
  • পুলক বেরা, তমলুক

    বাবা কাপড়ের দোকানের সামান্য কর্মী। ১৮ বছরের দেবাদিত্য মোটরবাইকের আবদার করেছিল। অক্ষমতার কথা জানান বাবা শঙ্কর দিন্দা। বলেছিলেন, 'এখনই এত টাকা কোথায় পাব!' এ কথা শুনেই বাড়ি থেকে অভিমান করে বেরিয়ে পড়েছিল ছেলে। সম্ভবত, নিজের রোজগারে মোটরবাইক কিনবে বলেই কাজ নিয়েছিল ডেকরেটারের কাছে। নতুন কাজের কথা বাড়িতে জানিয়েও ছিল রবিবার গভীর রাতে কলকাতার আনন্দপুরে ডেকরেটারের গুদামে আগুন লাগার পর থেকে খোঁজ নেই পূর্ব মেদিনীপুরের তমলুকের সেই দেবাদিত্যর।

    মা শর্মিষ্ঠার সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে রবিবারই। সে কথা জানিয়ে আঁচলে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে শুধু বলেছেন, 'কয়েক দিন পরে চলেও আসবে বলেছিল। বলেছিল পরীক্ষাটাও দেবে।' মাত্র এক সপ্তাহ আগের কথা। সবার অলক্ষ্যে বন্ধু, বয়সে কিছুটা বড় রামকৃষ্ণ মণ্ডলের সঙ্গে বাড়ি ছেড়েছিল তমলুকের শালিকা গড়চকের দেবাদিত্য। মঙ্গলবার, তাঁর এক প্রতিবেশী দাবি করেন, রবিবার রাত দেড়টা নাগাদ সোশ্যাল মিডিয়ায় সেলফিও পোস্ট করেছিল আঠেরোর যুবক। তার ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই আগুন লাগে। সেই আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায় পাশাপাশি দু'টি গুদাম। সেখানে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের কারও দেহই এমন অবস্থায় পাওয়া যায়নি, যা দেখে শনাক্ত করা সম্ভব।

    শুধু পুড়ে যাওয়া হাড়গোড় পাওয়া গিয়েছে। আশঙ্কা, যে প্রায় জনা তিরিশ কর্মী দু'টি গুদামে ছিলেন, তাঁদের মধ্যে হাতেগোনা কয়েক জন বেরোতে পারলেও বেশিরভাগই আটকে পুড়ে মারা গিয়েছেন। তাঁদেরই খোঁজে দিশেহারা নিকটাত্মীয়রা। দেবাদিত্য ছিল একাদশে ছাত্র। স্থানীয় টুলিয়া হাইস্কুলের পড়ত। গত মঙ্গলবার বাড়ি থেকে পালালেও রাতেই মা-কে ফোন করে। জানিয়েছিল, কলকাতার আনন্দপুরে ফুলের কাজ করবে। কয়েকদিন কাজ করে ফিরে আসবে। নিশ্চিন্ত হয়েছিল মায়ের মন। তারপর থেকে প্রায় নিয়মিত কথাবার্তা চলছিল। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা যাতে দেয়, তার জন্য বাড়ি থেকে বোঝানো চলছিল।

    প্রতিবেশীদের দাবি, ছোটবেলা থেকে পড়াশোনায় ভালোই ছিল দেবাদিত্য। লকডাউনের পর থেকেই ক্রমশই ঝোঁক বাড়ে মোবাইল গেম আর মোটরবাইকে। শর্মিষ্ঠাই জানিয়েছেন, রবিবারও ফোনে বাড়ি ফেরা নিয়ে কথা হয়েছিল। বলেছিল, কয়েক দিনের মধ্যেই ফিরবে। পরীক্ষাও দেবে। তারপর থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত যোগাযোগ নেই। সামনে রাখা মোবাইল বেজে উঠলেই চমকে উঠছেন শর্মিষ্ঠা। পাশে থেকে মা-কে সামলাতে ব্যস্ত দেবাদিত্যর দিদি। দুই ভাই-বোন। তিনি বড়। কলেজে পড়েন এবং তাঁর বিয়ের দেখাশোনাও চলছিল। কেঁদে ফেলেন বাবা শঙ্কর 'মেয়ের বিয়ের জন্য টাকা বাঁচাচ্ছিলাম। তাই বলেছিলাম, এত টাকা কোথায় পাব?'

    শঙ্কর জানান, কাছের গ্রামের শশাঙ্ক জানা ফোন করে আগুন লাগার কথা বাড়িতে জানান। সে খবর সোমবার সকালে তাঁদের কাছে পৌঁছয়। তারপর থেকে শর্মিষ্ঠা ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন বলে ফোন করে যাচ্ছিলেন। পাননি। বার বার জানতে চাইছিলেন, ও তো পালিয়ে অন্য কোথাও যেতে পারে। কাঁদতে কাঁদতে বাবা বলেন, 'তা হলে তো বাড়িতে ফোন করে খবরটা জানাত।' শঙ্করের প্রশ্ন, 'আচ্ছা, ওকে শেষবারের মতো দেখার কি কোনও সুযোগই পাব না?'

  • Link to this news (এই সময়)