ভস্মীভূত গুদাম থেকে উদ্ধার হচ্ছে একের পর এক দগ্ধ দেহ। টিভি খুলতেই এমন খবর দেখে, প্রায় ১৬ বছর ধরে বয়ে বেড়ানো দগদগে ক্ষত ভরা মনটা মোচড় দিয়ে উঠেছিল। কিছু ক্ষণের জন্য বাক্রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন ইছাপুরের বারিক দম্পতি।
সম্বিৎ ফেরে ঘড়িতে সাড়ে ১০টা বাজতে। ছেলেটাকে খাবার দিতে হবে যে! প্রতিদিনের মতো সোমবারেও ছেলে সৌরভ বারিকের ছবির সামনে রাতের খাবার সাজানো থালা রাখতে গিয়ে হাত কেঁপে গিয়েছিল বৃদ্ধ বাবা-মায়ের। ২০১০-এর ২৩ মার্চ স্টিফেন কোর্টের অগ্নিকাণ্ডে ঝলসে মৃত্যু হয়েছিল সৌরভের। তার পর থেকে আজও ছেলের মৃত্যুর ক্ষতিপূরণের জন্য প্রশাসন থেকে আদালতের দরজায় কড়া নেড়ে চলেছেন শৈলেন। নরেন্দ্রপুরের নাজিরাবাদে গুদামে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পরে তাঁর প্রশ্ন একটাই, ‘‘আমার মতো এই মৃতদের পরিজনদেরও কি দরজায় দরজায় ঘুরে বেড়াতে হবে?’’
এই প্রশ্ন নিয়েই রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি লিখেছেন শৈলেন। ২১ বছরের ছেলেকে হারানোর শোক বয়ে শাসকদলের বিধায়ক, নেতাদের কাছে আজও তিনি ঘুরে বেড়ান ফাইলপত্র নিয়ে। কিন্তু বৃদ্ধের অভিযোগ, উত্তর মেলে না কোথাও থেকেই। মঙ্গলবারও অসহযোগিতার সেই আক্ষেপ তাঁর গলায়।
নরেন্দ্রপুরের ঘটনায় এ দিনই প্রশাসন জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া দেহাংশ ডিএনএ পরীক্ষার পরে পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হবে। সে কথা শুনে শৈলেন বলছেন, ‘‘আমার ছেলের দেহ তো ডিএনএ পরীক্ষা করে পেতে হয়নি। তার পরেও যে সংস্থায় ছেলে কাজ করত, সেখান থেকে ক্ষতিপূরণ পাইনি।’’ তাঁর কথায়, ‘‘দিন-আনা দিন-খাওয়া এই শ্রমিকেরা যাঁদের কাছে কাজ করতেন, তাঁরা কি আদৌ আর ক্ষতিপূরণ দেবেন? না কি, শুধু প্রতিশ্রুতিতেই বছর কাটবে?’’
এক যুগেরও বেশি সময়ের দগদগে স্মৃতিটা এ দিন যেন বড্ড বেশি যন্ত্রণা দিচ্ছিল শৈলেনকে। ২০১০-এর ২৩ মার্চ অফিসে থাকার সময়েই খবর পেয়ে স্ত্রী কবিতাকে নিয়ে স্টিফেন কোর্টে পৌঁছে গিয়েছিলেন শৈলেন। অনেক খোঁজাখুঁজির পরে স্থানীয় হাসপাতালে গিয়ে দেখেছিলেন ছেলের নিথর দেহ। বৃদ্ধ জানাচ্ছেন, সরকারের তরফে লালবাজারের মাধ্যমে দু’লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ পেয়েছিলেন। তার পরে প্রায় পাঁচ বছর ছোটাছুটি করে ছেলের প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে পান ৬২ হাজার টাকা। কিন্তু, সৌরভ যে সংস্থায় কাজ করতেন, তারা বার বার মৌখিক প্রতিশ্রুতি দিলেও কিছু করেনি বলেই অভিযোগ শৈলেনের। তাঁর আরও অভিযোগ, সৌরভের ইএসআই থেকে কোনও টাকাও তিনি পাচ্ছেন না। তা নিয়ে মামলাও করেছেন।
নরেন্দ্রপুরের ঘটনায় মৃতদের পরিজনদেরও ভবিষ্যৎ তাঁর মতো লড়াইয়ের পথে হাঁটবে কিনা, তা নিয়ে সংশয়ী শৈলেন। বললেন, ‘‘ভোটের জন্য সরকার আগেভাগে ক্ষতিপূরণ দিয়ে দেয়। কিন্তু মালিকপক্ষ কি দায় এড়াতে পারে? কেন তাদের অন্যায়ের সুবিচার হয় না?’’ একমাত্র ছেলে সৌরভের মৃত্যুর পরের বছরে একটি শিশুকে দত্তক নিয়েছিলেন বারিক দম্পতি। সেই কল্লোল এখন ১৮ বছরে পা দিয়েছেন। তাঁকে ঘিরে শৈলেন-কবিতার নিত্যদিনের রোজনামচায় রয়ে গিয়েছেন আত্মজ সৌরভও।
২০১০-এর সেই অভিশপ্ত দিনের পরের কয়েক বছর স্টিফেন কোর্টের সামনে মোমবাতি জ্বালিয়ে মৃতদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনে যোগ দিতেন বারিক দম্পতি। এখন অবশ্য আর পার্ক স্ট্রিটের ফুটপাতে মোমবাতি জ্বলে না। ও দিকে যাওয়া বন্ধ করে সুবিচারের আশায় দিন গুনছেন শৈলেনরাও। কিছু দিন পরেই চোখের অস্ত্রোপচার হবে। বৃদ্ধের ঝাপসা দৃষ্টির চোখ আরও ঝাপসা হয়ে আসে টিভি দেখে।
সংবাদে তখন বলছে, আট জনের মতো দেহাংশ পৌঁছল কাঁটাপুকুর মর্গে!