লোকসভা নির্বাচনের আগে ২৬ এপ্রিল, ২০২৪ ঘাটালের জনসভা থেকে দেবকে পাশে নিয়ে রাজ্যের উদ্যোগে ‘ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান’ তৈরির কথা ঘোষণা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিধানসভা নির্বাচনের আগে বুধবার সিঙ্গুরের সভা থেকে সেই প্রকল্পের উদ্বোধন করলেন তিনি। এখানেও মঞ্চে মুখ্যমন্ত্রীর পাশে ছিলেন ঘাটালের সাংসদ দেব। ইতিমধ্যেই এই প্রকল্পে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে রাজ্য সরকার। দুই মেদিনীপুরের মোট ৮০১ বর্গ কিমি জায়গা জুড়ে তৈরি হবে এই বন্যা প্রতিরোধ প্রকল্প। যার জন্য মোট খরচ হবে ১৫০০ কোটি টাকা। তবে ‘ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান’ নিয়ে আলোচনা নতুন নয়, এর পিছনে রয়েছে প্রায় ৭৫ বছরের ইতিহাস।
ঘাটাল মূলত শিলাবতী, কংসাবতী এবং দ্বারকেশ্বর নদের শাখা নদী ঝুমির মধ্যবর্তী একটি এলাকা। ভৌগোলিক অবস্থানের জন্য ফি বছর বৃষ্টি হলেই জলমগ্ন হয়ে পড়ে ঘাটালের বিস্তীর্ণ এলাকা। বন্যা রোধে ঘাটালের তৎকালীন বাম সাংসদ নিকুঞ্জবিহারী চৌধুরী ১৯৫২ সালে লোকসভায় নদী সংস্কারের কথা তুলে ধরেন।
এর পরে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ১৯৫৯ সালে নদী বিশেষজ্ঞ মান সিংয়ের নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন করেন। সেই কমিশনই ঘাটালে বন্যা প্রতিরোধের একটি রিপোর্ট জমা দেয়। সেই সময়েই তৈরি হয় এই মাস্টার প্ল্যান। রাজ্যে পালাবদলের পরে ১৯৭৮ সালে ভয়াবহ বন্যায় রাজ্যের অন্যান্য জেলার পাশাপাশি বিপুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল ঘাটালের বিস্তীর্ণ এলাকা। এর পরে ১৯৮২ সালে বাম আমলের তৎকালীন সেচমন্ত্রী প্রভাস রায় এই মাস্টার প্ল্যানের শিলান্যাস করেছিলেন। ঘাটাল সেতুর কাছে সেই ফলক আজও রয়েছে। এর পরে শিলাবতী, কংসাবতী দিয়ে বহু জল গড়িয়েছে। মাস্টার প্ল্যান চলে যায় কালের গর্ভে।
বিষয়টি ফের চাগাড় দিয়ে ওঠে তৃণমূলের জমানায়। এই কেন্দ্র থেকে ২০১৪ সালে অভিনেতা দেব-কে লোকসভার টিকিট দেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সাংসদ হওয়ার পরে লোকসভায় ঘাটাল প্ল্যান কার্যকর করার ব্যাপারে একাধিক বার আবেদন করেন দেব। শুরুতে এই প্রকল্প কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের উভয়ের অর্থ সাহায্যে করার কথা থাকলেও তা আর হয়ে ওঠেনি। বর্তমানে রাজ্য সরকার নিজের উদ্যোগে তৈরি করতে চলেছে এই কাজ।
ঘাটাল মাস্টার প্লান রূপায়ণ সংগ্রাম কমিটির যুগ্ম সম্পাদক নারায়ণ চন্দ্র নায়ক বলেন, ‘রাজ্য সরকারের এই উদ্যোগ আমাদের কমিটির নেতৃত্বে মাস্টার প্ল্যান এলাকার বাসিন্দাদের দীর্ঘ আন্দোলনের ফল।’ তবে উদ্বোধনের স্থান সিঙ্গুরের পরিবর্তে ঘাটালে হলে ভালো হতো।’ গত কয়েক মাস আগে থেকে মাস্টার প্ল্যানের কাজ শুরু হলেও কাজের গতি খুবই শ্লথ বলে অভিযোগ করেন নারায়ণবাবু। পাশাপাশি নদী ও খাল সংস্কার-সহ ওই সমস্ত কাজ দ্রুত রূপায়ণের দাবি জানান তিনি।
দুই মেদিনীপুর জেলার ১৩ টি ব্লকের কুড়ি লক্ষাধিক মানুষকে ফি বছরের বন্যার হাত থেকে মুক্তি দিতে তৈরি হয়েছিল এই মাস্টার প্ল্যান। স্থানীয় বাসিন্দারা ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান রূপায়ণ সংগ্রাম কমিটি গঠন করে আন্দোলন সংগঠিত করলে নতুন করে প্রকল্পটি পুনর্মূল্যায়ন করা হয়। শিলাবতী-কংসাবতী-রূপনারায়ণ নদী-সহ বিভিন্ন নিকাশি খালগুলি সংস্কারের উদ্যোগ নেয় সেচ ও জলপথ দপ্তর। শিলাবতী নদী সংস্কারের কাজ প্রায় দু’মাস আগে শুরু হলেও এখনও এক কিলোমিটার অংশ সংস্কার হয়নি।
ঘাটাল সাংগঠনিক জেলা তৃণমূলের সভাপতি অজিত মাইতি বলেন, ‘উনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভারতের ব্যতিক্রমী একজন নেত্রী। তাই কাজ শুরু করার পর উদ্বোধন করলেন। দেখিয়ে দিলেন বিরোধীদের, দেখুন কাজ চলছে ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের। আর তা শেষও হবে।’ ঘাটাল সাংগঠনিক জেলা বিজেপি-র সভাপতি তন্ময় দাস বলেন, ‘নির্বাচনের আগে গিমিক ছাড়া কিছুই নয়! ৫০০ কোটি টাকায় ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান হবে? হাস্যকর! শুধু কয়েক জায়গায় খোঁড়াখুঁড়ি চলছে মাত্র।’