মহারাষ্ট্রে ভোট কভার করতে যাওয়া যে কোনও সাংবাদিকের কাছে বারামতি চিরকালই মক্কা। তার কারণ একটাই— গত প্রায় পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে মহারাষ্ট্রের শাসন যাঁরা করেছেন তাঁর মধ্যে অগ্রগণ্য হচ্ছেন শরদরাও পাওয়ার, তা তিনি ক্ষমতায় থাকুন বা না থাকুন। শরদ পাওয়ারের নিজের জন্মস্থান, কর্মক্ষেত্র সবটাই বারামতিকে ঘিরে। তাই সব সাংবাদিকের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ এই জায়গা। আর কোথাও তাঁরা যান বা না যান, সকলকে পশ্চিম মহারাষ্ট্রের বারামতিতে যেতেই হবে। পুনে থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরত্বে ছোট সুন্দর একটি শহর বারামতি। শরদ পাওয়ারের কল্যাণে রাস্তাঘাটও সেখানে খুব সুন্দর। সেখানেই আমি ১৯৯৫ সাল থেকে ২০০৪ পর্যন্ত প্রত্যেকটা ভোট কভার করতে গিয়েছি এবং অবশ্যই বারামতি গিয়েছি।
এই কথা আজ লেখার একটাই কারণ, বুধবারই বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে অজিত পাওয়ারের। কালক্রমে মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ নাম হয়ে উঠেছিলেন অজিত। এরই পাশাপাশি কাকা শরদ পাওয়ারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের টানাপড়েনের বিষয়েও আমরা সকলেই অবহিত। এই বারামতিতে যখন আমি গিয়েছি, সেখানে কী কাজ হয়েছে, মানুষ কী চান, শরদ পাওয়ারকে মানুষ কতটা ভালোবাসেন— তা কলকাতার এই সাংবাদিককে একাধিক বার ঘুরিয়ে দেখিয়েছেন অজিত পাওয়ার। কখনও উঁচু স্বরে কারও সঙ্গে কথা বলতে দেখিনি। ধীরে ধীরে কথা বলতেন এবং মানুষের সঙ্গে কথা বলায়, মেশায় তাঁর জুড়ি মেলা ভার।
২০০৪-এর মে মাসের ঘটনা স্পষ্ট মনে আছে আমার। এমনিতেই গরম, ওই জায়গায় যেন সেটা আরও বেশি। ওখানে দিনের বেলায় সে ভাবে প্রচার হয়ই না। আমাকে রাতের বেলায় বারামতি সংলগ্ন কয়েকটি গ্রামে তাঁর বিশাল SUV- তে করে নিয়ে গিয়ে ঘুরিয়েছেন। ছোটো ছোটো জমায়েতেও তিনি আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে ঠেট মারাঠিতে কথাবার্তা বলছিলেন কয়েক জন। সেই ভাষা আমি না বুঝলেও, এটা বুঝতে কোনও অসুবিধা হয়নি যে, আমআদমির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল কতটা গভীর। সে সময়ে তাঁর বয়সও কম। অজিতরাও পাওয়ারই ছিলেন শরদরাও পাওয়ারের আইজ় অ্যান্ড ইয়ার্স।
ঘটনাচক্রে যে বারামতির ভূমি থেকে তাঁর উত্থান সেই বারামতিতেই ভূমি নিলেন তিনি!
অনেকেই একটা জিনিস জানেন না, বারামতিতে ভোটের সময়ে সবচেয়ে কম সময় ব্যয় করতেন শরদ পাওয়ার, তা তিনি কংগ্রেসে থাকার সময়েই হোক বা এনসিপিতে। তখন তাঁকে গোটা মহারাষ্ট্র চষে বেড়াতে হতো। প্রচার-পর্ব সাঙ্গ হওয়ার আগে শেষ ২ ঘণ্টা তিনি বরাদ্দ রাখতেন বারামতির জন্য। বারামতিতে একটা জায়গা আছে ভিগুয়ান চক, যেখানে প্রথমে কংগ্রেস এবং পরে এনসিপির অফিস হয়। সে এলাকায় তিনি শেষতম প্রচার করতেন। কিন্তু সেই প্রচারের আগে পর্যন্ত লোকজনকে আনা, সব ঠিকঠাক ম্যানেজ করা, নিজে প্রচার করা, মানুষের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন, যাবতীয় সব কিছুই করতেন অজিতরাও।
বারামতির অদূরে ইন্দাপুরই হচ্ছে তাঁদের জন্মস্থান। বারামতিতে একটা সময় পর্যন্ত শরদ পাওয়ারের প্রতিনিধি ছিলেন অজিত পাওয়ার— যে অজিত পাওয়ারকে আমি দেখেছি।
ঘটনাচক্রে যে বারামতির ভূমি থেকে তাঁর উত্থান সেই বারামতিতেই ভূমি নিলেন তিনি!