• ‘কৃষিজমি দখল করে শিল্প নয়’, সিঙ্গুরে বললেন মমতা
    আজকাল | ২৯ জানুয়ারি ২০২৬
  • আজকাল ওয়েবডেস্ক: প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সভার ১০ দিন পরে সিঙ্গুরে সভা করলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। মোদির মুখে সিঙ্গুর নিয়ে বিশেষ কোনও কথা না থাকলেও, মমতার মুখে শুধুই সিঙ্গুর। এদিনের সভা থেকে ঘোষণা করলেন একগুচ্ছে প্রকল্পের। আশ্বাস দিলেন কর্মসংস্থানের। পাশাপাশি বললেন, “কৃষিও চলবে, শিল্পও চলবে। কৃষিজমি দখল করে শিল্প নয়।”

    এদিন মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “সিঙ্গুর আমার প্রিয় জায়গা। আমার আন্দোলনের একটা বড় অংশ ২০০৬ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত জুড়ে রয়েছে সিঙ্গুর। এই সিঙ্গুরের মাটিতে আমি অনেকগুলো দিন কাটিয়েছি। রাস্তায় পড়ে থেকেছি। সিঙ্গুরের মানুষরা বাড়ি থেকে কেউ মুড়ি, চিড়ে, নারকেল নারু নিয়ে এসেছে। যারা ধর্নায় বসেছিল তাঁদের জন্য কেউ সবজি নিয়ে এসেছে। আমি সিঙ্গুর আন্দোলনের জন্য ২৬ দিন অনশন করেছি। তাই সকলকে অভিনন্দন জানাই। আপনারা আমার চেতনা। সিঙ্গুরের পাশেই ফুরফুরা শরিফ। তার উন্নয়ন বোর্ড তৈরি করেছি। ১০০ বেডের হাসপাতাল করেছি। পাশেই তারকেশ্বরে মন্দির উন্নয়ন করেছি। এছাড়া কামারপুকুর জয়রামবাটি, সেখানেও উন্নয়নের জন্য ১০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। তারকেশ্বর-বিষ্ণুপুর রেললাইন আমি করে গেছিলাম। ওরা সেটার ফিতে কেটেছে। আমি করে গেছিলাম কারণ ওখানে কোনও রেললাইন ছিল না। রাজ্যের সব জেলা মিলিয়ে মোট ১৬৯৪টি পরিষেবার উদ্বোধন ও শিলান্যাস করা হয়েছে। যার মোট মূল্য ৩৩ হাজার ৫৫১ কোটি টাকা। বাংলার বাড়ি আগে আমরা এক কোটি করে দিয়েছি। কিছুদিন আগেও ১২ লক্ষ বাড়ি দিয়েছি। আজ ২০ লক্ষ মানুষের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা পৌঁছে যাবে। দিল্লি এক পয়সাও দেয় না। যারা টাকা পেয়ে যাবেন সঙ্গে সঙ্গে ইট গাঁথতে শুরু করে দেবেন। মোট ৩২ লক্ষ হল। আর যেটুকু বাকি রইল আগামী দিনে ধাপে ধাপে করে দেওয়া হবে। আমি চাইনা কেউ কষ্ট করে থাকুন। দুর্যোগে যাদের বাড়ি ভেঙেছে তাঁদের বাড়িও করে দিলাম।” 

    এদিনের মঞ্চ থেকে কৃষিজ পণ্যবাহী ৫০ নতুন সুফল বাংলা যান রাজ্যবাসীকে উপহার দেন মমতা। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ফসলের ক্ষতি বাবদ ৮০ কোটি টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন। এর ফলে রাজ্যের দু’লক্ষ ৩৫ হাজার কৃষক উপকৃত হবেন। এছাড়াও মেশিনারি হাব, কৃষি, পাট্টা বিতরণ, আদিবাসী উন্নয়ন, বিদ্যুৎ,স্বাস্থ্য, শ্রম, রাস্তা ঘাট, মাদ্রাসা শিক্ষা-সহ রাজ্য জুড়ে ৫৬৯৬ কোটি টাকার মোট ১০৭৭টি প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। প্রকল্পগুলি শুরু ২০২৬ থেকেই। বাস্তবায়ন হবে আগামী ২০৩১ সালের মধ্যে। একইসঙ্গে ৬১৬টি প্রকল্পের শিলান্যাস করেন মুখ্যমন্ত্রী। ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান বাদ দিলে প্রকল্প মূল্য দাঁড়ায় ২১৮৩ কোটি টাকা। পাশাপাশি বাংলার বাড়ি গ্রামীণ আবাসন প্রকল্পের আর্থিক সহায়তা তুলে দেন অসীমা ধারা, সুপর্ণা বাগ, আমিনা বেগম, চায়না রায়-সহ দশ জনের হাতে।

    সিঙ্গুরের শিল্প প্রসঙ্গে মমতা বলেন, “সিঙ্গুরের মানুষ, যারা জমি হারিয়েছিল আজও তাঁরা টাকা পায়।সম্পূর্ণ খাদ্যসাথী পায়। স্বাস্থ্যসাথী পায়। লক্ষীর ভান্ডার পায়। কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে এখানে আট একর জমির উপর ৯ কোটি ২০ লক্ষ টাকা খরচ করে ‘সিঙ্গুর এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক’ গড়ে তোলা হয়েছে। সেখানকার ২৮টি প্লটের মধ্যে ২৫টি বরাদ্দ হয়ে গেছে। কর্মসংস্থান হবে। কৃষিও চলবে, শিল্পও চলবে। কৃষিজমি দখল করে শিল্প নয়।” 

    এখানেই থামেননি মমতা। তিনি আরও বলেন, “আরও একটি প্রকল্প আমরা হাতে নিয়েছি। এসএআইপি-র অধীন, ৭৭ একর জমিতে প্রাইভেট ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক সিঙ্গুরে হচ্ছে। অ্যামাজন এবং ফ্লিপকার্ট এখানে বড় ওয়্যার হাউস তৈরি করছে। হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। আমরা মুখে বলি না। কাজে করে দেখাই। একশো দিনের কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। ওরা মহাত্মা গান্ধীর নাম তুলে দিয়েছে। আমরা মহাত্মা গান্ধীর নামে মহাত্মাশ্রী, কর্মশ্রী প্রজেক্ট চালু করেছি। একশো দিনের কাজ বাংলায় চলছে এবং চলবে। রাজ্যের টাকায় চলবে। ভিক্ষা করব না।”

    উন্নয়ন প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, “অনেক মানুষ কথা দিয়ে কথা রাখে না। মনে রাখবেন, আমি কথা দিলে প্রাণ গেলেও সেই কথা একশো শতাংশ সেই কথা রাখি। আমি ডবল ইঞ্জিন সরকার নই। আমাদের সরকার মানুষের সরকার। মা-মাটি-মানুষের সরকার। কন্যাশ্রী কবে চালু হয়েছে, বন্ধ হয়েছে? ওবিসি-রা মেধাশ্রী পাচ্ছে। সংখ্যালঘুরা পাচ্ছে ঐক্যশ্রী। আমরা নম্বর এক। স্বামী বিবেকানন্দ স্কলারশিপ রয়েছে। স্মার্ট কার্ড স্টুডেন্টদের দশ লাখ টাকা করে করে দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া তপশিলি, অধিবাসীদের জন্য আলাদা প্রকল্প আছে। আমরা চাই আমাদের ছেলেমেয়েরা এগিয়ে যাক। নবম শ্রেণীতে উঠলেই সবুজ সাথী সাইকেল। একাদশ শ্রেণীতে তরুণের স্বপ্ন ট্যাব। সবই বিনাপয়সায় করা হচ্ছে। আশাকর্মী এবং আইসিডিস-দের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে কয়েক মাস আগেই ১০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। যাঁদের চাষবাস নষ্ট হয়ে যায়, আমরা তাঁদের বিনা পয়সায় ইন্সিওরেন্স করে দেই। কৃষকদের ১০ হাজার টাকা করে দেই। যাদের এক কাঠা জমিও আছে, তাঁরা পান চার হাজার টাকা। আমরা শস্যবিমায় চার হাজার কোটি টাকা কৃষকদের দিয়েছি। প্রায় সাত লক্ষ মানুষকে আমরা পাট্টা দিয়েছি জমির। আজকেও পাট্টা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ২৯০টি উদ্বাস্তু কলোনিকে আমরা স্বীকৃতি দিয়েছি।”

    ধ্রুপদী ভাষাকে স্বীকৃতি তিনি বলেন, “এখানে দাঁড়িয়ে একজন বলে গেলেন, তাঁরা নাকি ধ্রুপদী ভাষাকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। আমি বলি ঝুট হ্যায়, সম্পূর্ণ মিথ্যে। আপনি করেননি। আপনার সরকার করেনি। আমরা বাধ্য করেছি আপনাকে করতে। এর জন্য আমাদের রিসার্চ টিম গঠন করতে হয়েছিল। বাংলা ভাষায় কথা বললে বিহার, উত্তরপ্রদেশ, ওড়িশায়, রাজস্থানে, মধ্যপ্রদেশে মারধর করেন। কই আমরা তো কাউকে মারি না। আমরা তো কারও অধিকার কেড়ে নিই না। কেনও কেঁড়ে নেব? কেউ আমার পক্ষে থাকতে পারেন, কেউ বিপক্ষে। এটাই তো গণতন্ত্র। তাহলে কি তাঁকে হত্যা করতে হবে। খুন করতে হবে। এজেন্সি লাগাতে হবে। এই সব করে কিছু করা যায় না। আমাকে আঘাত না করলে আমি খুব ঠাণ্ডা, শীতল বাতাসের মতো। আর আমাকে আঘাত করলে আমি প্রত্যাঘাত করি, আমি টর্নেডো হয়ে যাই, তুফান হয়ে যাই, কালবৈশাখী হয়ে যাই।
  • Link to this news (আজকাল)