• ১৮-এর স্বপ্ন কেড়ে নিল আনন্দপুরের অগ্নিকাণ্ড
    আজকাল | ২৯ জানুয়ারি ২০২৬
  • গোপাল সাহা

    বয়স মাত্র ১৮। চোখে একরাশ স্বপ্ন নিয়ে বেড়ে ওঠা, কিন্তু পরিবার অত্যন্ত অভাবী। কিন্তু স্বপ্ন ছিল বাবা-মাকে একটা সুন্দর জীবন দেওয়া এবং ভবিষ্যতে অনেক বড় হওয়া। কিন্তু আনন্দপুর নাজিরাবাদের অগ্নিকাণ্ডে ছেলেটির সব স্বপ্ন পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে। খোঁজ মিলছে না তাঁর। আর্তনাদ করে কান্না, মা বাবা ও দিদির। ছেলের কোন হদিশ নেই। অনুমান করা হচ্ছে অগ্নিকাণ্ডে সব শেষ। স্বপ্নগুলি ভেঙে চুরমার। ছেলেটির নাম দেবাদিত্য দিন্দা।

    সামনেই উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা। পরীক্ষায় ভাল ফল করতে হবে। অনেক বড় হতে হবে, তাই জোর কদমে চলছিল প্রস্তুতি। অনটনের কারণে পড়াশোনাকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে আসা মেদিনীপুর থেকে কলকাতায়। একদিকে কলকাতা দেখার কৌতূহল, পাশাপাশি টাকা উপার্জন। কারণ সামনে আবার দিদির বিয়ে। কিছু টাকা বাড়িতে নিয়ে যেতে পারলে দিদির বিয়েতে সহযোগিতা হয়। সেই চিন্তা করেই কলকাতায় আনন্দপুর সংলগ্ন নরেন্দ্রপুর থানা এলাকার নাজিরাবাদে এসেছিল ছোট্ট ছেলেটি তাঁর স্থানীয় এক প্রতিবেশী দাদার সঙ্গে। এসেছিল ফুলের কাজ করবে এবং যা উপার্জন হবে তা তুলে দেবে পরিবারের হাতে। 

    ২৩ জানুয়ারি সরস্বতী পুজোর দিন বাড়ি ফেরার কথা ছিল দেবাদিত্যর। এরপর হঠাৎ সিদ্ধান্ত বদল করে বাড়িতে জানিয়ে দেয় যে সেদিন ফিরবে না। কলকাতায় সরস্বতী পুজোর আনন্দট ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছিল না তাঁর। সঙ্গে আরও বেশি কাজ করে কিছু উপর আয়ও হবে। বাগদেবীর আরাধনা কলকাতায় কেমন হয় এবং কতটা আনন্দ হয় সেটাও নিজের চোখে চাক্ষুস করে যাওয়ার আনন্দটা ছাড়তে চাইনি সে। কিন্তু দেবাদিত্য স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি, তাঁর সরস্বতী পুজো উপভোগ করে আর বাড়ি ফেরা হবে না। 

    ২৫ জানুয়ারি রাত ১০টা নাগাদ ভিডিও কলে কথা হয়েছিল পরিবারের সঙ্গে। তাঁর মা গৃহিণী আর বাবা ঠিকা কাজ করেন। চোখে একরাশ স্বপ্ন নিয়ে দেবাদিত্যকে ২৬ তারিখ ভোররাতে চলে যেতে হল অগ্নিকাণ্ডের  শিকার হয়ে। পরিবারের সঙ্গে শেষ কথা বলার আগুনে জীবন্ত দগ্ধ হতে হয়েছে দেবাদিত্যকে। তার পাশাপাশি পুড়েছে তাঁর পরিবারের স্বপ্নগুলিও। আজ সবটাই অতীত। দিদির বিয়ে, তাঁর জীবনের সুন্দর একটা ভবিষ্যৎ, বাবা-মাকে সচ্ছল জীবন দেওয়া সব ছাই হয়ে গিয়েছে। চারিদিকে শুধু আর্তনাদ আর হাহাকার আর চোখের জল। চারিদিকে শুধু ধোয়া আর পোড়া মাংসের গন্ধ। ছাইয়ের স্তূপের মধ্যে চেনা যাচ্ছে না, কে দেবাদিত্য আর বাকিরা কে। ১৮ বছরের দেবাদিত্য শুধু একা হারিয়ে যায়নি, আনন্দপুরের অগ্নিকাণ্ডে আরও এমন বহু দেবাদিত্যর স্বপ্ন পুড়ে ছারখার হয়েছে এই মৃত্যুপুরীতে। 

    পুলিশ সূত্রে খবর, এখনও পর্যন্ত মোট ২১ জনের দেহাংশ উদ্ধার হয়েছে আনন্দপুর অগ্নিকাণ্ডে। পূর্বেই প্রশাসন জানিয়েছিল ১৬ জনের দেহাংশ উদ্ধার হয়েছে। পরবর্তীতে আরও পাঁচ জনের দেহাংশ উদ্ধার হয়েছে এবং ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হচ্ছে। অর্থাৎ এখনও পর্যন্ত মোট ২১ জনের দেহাংশ উদ্ধার হয়েছে বলেই পুলিশের সূত্রে খবর। 

    গ্রেপ্তার করা হয়েছে ডেকোরেটর সংস্থার মালিক গঙ্গাধর দাস। দমকল বাহিনীর লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে নরেন্দ্রপুর থানা তাঁকে গড়িয়ার এক কাঠের দোকান গ্রেপ্তার করেছে। বুধবারই তাঁকে আদালতে তোলা হয়েছে। আদালত তাকে আট দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছে। 

    ময়নাতদন্তের পর দেহাংশ পাঠানো হবে ডিএনএ টেস্টের জন্য। এরপরে প্রত্যেকের পরিবারে হাতে তাঁদের পরিজনের দেহাংশ ফিরিয়ে দেওয়া হবে। এখনও পর্যন্ত ২৭ জনের পরিবার মিসিং ডাইরি করেছে। তবে দেহাংশগুলি তাঁদের মধ্যে ২১ জনের কি না সে নিয়ে স্পষ্ট করে কিছু জানায়নি প্রশাসন। পুলিশ সূত্রে খবর, মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। তবে ডিএনএ টেস্টের জন্য পরিবারের সদস্যদের রক্ত সংগ্রহ করার কাজ চলছে। 
  • Link to this news (আজকাল)