ঈশ্বরের জননী! লন্ডনে ছাপা ২০০ বছরের বিতর্কিত বই এবার মেলায়
বর্তমান | ২৯ জানুয়ারি ২০২৬
সৌম্য নিয়োগী, কলকাতা: নতুন বইয়ের গন্ধ। স্টলে ঝকঝকে প্রচ্ছদের উপর ঝুঁকে পড়া মুখ। বইমেলার এই চেনা ছবি আচমকা অচেনা হয়ে যায় ৫৪৫ নম্বর স্টলে এসে। এখানে থমকে গিয়েছে সময়। দেওয়ালের তিনদিকে র্যাক। মলাট খসা, পোকায় কাটা, জীর্ণ বইয়ের সারি। স্টলের মধ্যিখানে বড়ো টেবিল। তাতেও স্তূপাকৃত বই। আর দরজার কোণে টেবিলের নীচে মলাট-ছেঁড়া বইয়ের একটি প্যাকেট আগলে বসে শুভাশিস ভট্টাচার্য। প্যাকেটটি আড়াল করেও উৎকণ্ঠা কাটে না তাঁর। কেন? জবাব দিল প্যাকেটের ভিতরে থাকা বইটি। তা খোলস ছেড়ে বেরতেই অনেককালের ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটা এল নাকে। ধাক্কা মারল প্রায় সওয়া দুশো বছরের পুরানো জীর্ণ হলদেটে কাগজের ঘ্রাণ! লন্ডনের উড স্ট্রিট থেকে ছাপা এ এক আশ্চর্য কেতাব— ‘দ্য ট্রু এক্সপ্ল্যানেশন অব দ্য বাইবেল’। বাঁধাই প্রায় খুলে আসা প্রথম পাতাটিতে আঙুল দিলেন শুভাশিসবাবু। দেখালেন ছাপার অক্ষরে লেখা-১৮০৪ খ্রিস্টাব্দ। দেখে মাথা চক্কর দেয়। গোটা বইমেলাটা যেন টাইম মেশিনে ঢুকে লহমায় পৌঁছে দেয় ২০০ বছর আগের কোনও ছাপাখানায়। কানে আসে প্রাচীন কোনো মুদ্রণ যন্ত্রের ঘড়ঘড় শব্দ।এ হল ২২২ বছর আগে এক ব্রিটিশ মহিলার স্বপ্নে পাওয়া দৈববাণীর সংকলন। দাম সে যুগে ছিল ১৮ পেন্স। ৩৯২টি পাতা। আগাগোড়া ছন্দে লেখা সেই দৈববাণী যিনি উচ্চারণ করেছিলেন, তাঁর নাম জোয়ানা সাউথকোট। বইটিতে রেভারেন্ড মিস্টার পমেরয় নামের এক সাহেবের সঙ্গে তাঁর পত্রালাপও ছাপা। তা পড়লে গায়ে কাঁটা দেয়। ফের মনে হয়, টাইম মেশিনে ঢুকিয়ে দিয়েছে কেউ।বিলেতের সাধারণ একটি কৃষক ঘরের মেয়েটি অদ্ভুত সব কাণ্ড ঘটিয়ে কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন দুনিয়া। দাবি করেছিলেন, তাঁর কানে নাকি সরাসরি ঈশ্বরের কথা ভেসে আসে। ৬৪ বছর বয়সে মানুষ যখন নাতি-পুতি নিয়ে সময় কাটায়, সেই বয়সে জোয়ানা ঢাকঢোল পিটিয়ে ঘোষণা করলেন— ‘তিনি মা হতে চলেছেন। বড়োদিনে তাঁর গর্ভে আসছেন স্বয়ং ঈশ্বর।’ লন্ডনে হুলুস্থুল। ডাক্তাররা থ। জনতা দু’ভাগে বিভক্ত, কেউ তাঁকে দেবী মানছেন, কেউ বলছেন চরম উন্মাদ, ভণ্ড! শেষ পর্যন্ত অবশ্য ঈশ্বর ভূমিষ্ঠ হননি। কারণ ক্রিসমাসের পরদিনই জোয়ানা মারা যান। ময়নাতদন্তে জানা যায়, তিনি অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন না। অসুস্থতার কারণেই ওই ‘ফেক প্রেগন্যান্সি’! যদিও সেকথা মানতে চাননি অগণিত ভক্ত। মৃত্যুর আগে একটি সিন্দুক রেখে গিয়েছিলেন ‘অনাগত ঈশ্বরের জননী’। শর্ত ছিল, দেশের খুব বিপদ না হলে কেউ যেন সিন্দুক না ছোঁয়। এক শতাব্দী পর ইংল্যান্ডের ২৪টি চার্চের বিশপদের উপস্থিতিতে সিন্দুক খোলার কথা হয়। কিন্তু কোনো বিশপ রাজি হননি। ফলে রহস্যময় সেই সিন্দুক রহস্যই থেকে যায়। তাতে কী আছে, তা আজও লোক চোখের আড়ালে।জোয়ানার জীবনের সেই রহস্যের আঁচই লাগল এসে কলকাতায় এবারের বইমেলায়। ৯ নম্বর গেট দিয়ে ঢুকে ডানদিকে প্রথম গলিতেই বেমানান একটি মাঝারি খুপরি। মাথায় লেখা ‘সবুজপত্র প্রকাশন’। সেটি দুষ্প্রাপ্য বইয়ের গুরুত্বপূর্ণ ঠিকানা। স্টলকর্তা শুভাশিসবাবু জানালেন, উত্তর কলকাতার এক বনেদি বাড়ি থেকে দু’শতাব্দী প্রাচীন বইটি উদ্ধার করেছিলেন অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে। বইটি প্রায় অমূল্য।১৮০৪ সালের এক জ্যান্ত রহস্য বইমেলায় সকলের চোখের সামনে। এ দেখার সুযোগ জীবনে খুব বেশি আসে না।