ঘাটাল মাস্টারপ্ল্যানের উদ্বোধন কেন সিঙ্গুরেই করলেন মমতা? আসলে যা মিলেমিশে গেল...
আজ তক | ২৯ জানুয়ারি ২০২৬
মেলালেন, তিনি মেলালেন! আপাতত দৃষ্টিতে 'বকচ্ছপ' মনে হলেও দিনের শেষে বাংলার রাজনীতিতে এই দুটি একটি স্থায়ী ইস্যু। ভোট ন্যারেটিভ বদল হয়। কিন্তু কিছু ইস্যুর দীর্ঘস্থায়ী বন্দোবস্ত থাকে। তার মধ্যেই দুটি অন্যতম। প্রথমটা সিঙ্গুর। দ্বিতীয়টি, ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান।
সিঙ্গুরের সভায় ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের উদ্বোধন করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ঘাটালের সাংসদ দেবকে পাশে নিয়ে। দেবও যারপরনাই আপ্লুত। বললেন, 'কেউ কথা রাখেনি। দিদি কথা রাখলেন।' তাহলে সিঙ্গুরে শিল্পের ব্যাপারটা? সব যেন ঘেঁটে গেল! সিঙ্গুরের মাটিতেই কেন ঘাটাল মাস্টারপ্ল্যানের উদ্বোধনের ঘোষণা করলেন মমতা? প্রশ্নটার উত্তর খোঁজা যাক।
'সিঙ্গুর আমার ফেভারিট জায়গা'
২০০৬ সাল থেকে ২০২৬। দু'দশক ধরে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা ও লোকসভা ভোটে ইস্যু সিঙ্গুর। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, 'সিঙ্গুর আমার ফেভারিট জায়গা।' বিজেপি-র দাবি, তারা ক্ষমতায় এলে টাটা গোষ্ঠীকে ফেরাবে। যদিও গত ১৮ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মুখে এরকম কিছু শোনা যায়নি। টাটাদের বিতর্কিত জমিতে দাঁড়িয়ে সিঙ্গুরে টাটা গোষ্ঠীর অটোমোবাইল কারখানা বা শিল্প ফেরানোর কোনও দাবি করেননি। সিঙ্গুরের মাটিতেই শিল্প হবে, এরকম কিছু শোনা যায়নি মোদীর গলায়।
ঠিক ১০ দিন পরে মমতা গেলেন সিঙ্গুর। বললেন, '৭৭ একর জমিতে প্রাইভেট ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক গড়ে তোলা হচ্ছে। হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। অ্যামাজন আর ফ্লিপকার্ট এখানে বড় ওয়্যারহাউস তৈরি করছে। যেটা আমরা ইতিমধ্যেই ক্লিয়ার করেছি। আমরা মুখে বলি না। আমরা কাজে করি।'
দু'দশকে রাজনীতির আমূল বদল, কিন্তু প্রশ্নটা একই
২০০৬ সালে বিধানসভা নির্বাচনের পরেই তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ঘোষণা করেছিলেন রাজ্যে টাটা গোষ্ঠীর বিনিয়োগের কথা। রাইটার্স বিল্ডিংয়ে বুদ্ধদেবের সঙ্গে এসে সাক্ষাৎ করেছিলেন রতন টাটা। যে পর্বে সিঙ্গুরে শিল্প স্থাপনের সলতে পাকানো শুরু হয়েছিল, তখন রাজ্য বিধানসভায় বামেদের বিধায়ক সংখ্যা ছিল ২৩৫। প্রধান বিরোধী হলেও তৃণমূলের সংখ্যা ছিল ৩০। দু’দশক পরে ২০২৬ সালে সেই ছবি আমূল বদলেছে। কিন্তু যেটা বদল হয়নি, তা হল, সিঙ্গুরে শিল্প হবে নাকি হবে না, এই প্রশ্নটির।
ঘাটাল মাস্টারপ্ল্যান বাংলার রাজনীতির অন্যতম 'স্ট্রং কিওয়ার্ড'
এবার আসা যাক ঘাটাল মাস্টারপ্ল্যানের বিষয়ে। সিঙ্গুরে দেবকে নিয়ে গেলেন মমতা। ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের উদ্বোধন সারলেন। বস্তুত, ঘাটাল মাস্টারপ্ল্যান বাংলার রাজনীতির অন্যতম 'স্ট্রং কিওয়ার্ড'। সার্চ ইঞ্জিন জমানার বহু আগে থেকেই। সেই ৫০-এর দশকের কথা। বর্ষাকালে বন্যায় পশ্চিম মেদিনীপুরের বিস্তীর্ণ অংশ ডুবে যায়। তত্কালীন বাম সাংসদ নিকুঞ্জবিহারী চৌধুরী বিষয়টি নজরে আনেন সংসদে। একটি বিশেষ কমিটি তৈরি করা হয় ও ঘাটাল মাস্টারপ্ল্যানের প্রস্তাব দেওয়া হয়। এই ঘটনা ১৯৫৯ সালের। এবার আসা যাক ৮০-র দশকে। ১৯৮৩ সালে ঘাটাল মাস্টারপ্ল্যান প্রকল্পের শিলান্যাস করেছিলেন তত্কালীন সেচমন্ত্রী প্রভাস রায়। এরপর ১৯৯৩ সালে ঘাটাল মাস্টারপ্ল্যান রূপায়ণ সংগ্রাম কমিটি তৈরি করেন ঘাটালের বাসিন্দারাই।
সিঙ্গুর-ঘাটাল মিলে গেল
১৮ তারিখ প্রধানমন্ত্রীর মুখে সিঙ্গুরে শিল্প আনার প্রসঙ্গের কোনও রকম বক্তব্য না-পেয়ে রাজ্যবাসী তাকিয়ে ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকে। কিন্তু মমতার মুখেও সিঙ্গুরে শিল্পের বিষয়ে যা শোনা গেল, তা নিয়ে উত্সাহী হওয়ার মতো কিছু ঘটেনি। আসলে মমতা হোক বা মোদী, সিঙ্গুরে রাজনৈতিক সভা হলে বিশেষ নজর থাকে সব মহলেরই। সেই স্পটলাইটকেই কার্যত কাজে লাগালেন মমতা। ঘাটাল মাস্টারপ্ল্যান উদ্বোধনের জন্য তাই বেছে নিলেন সিঙ্গুরের মঞ্চকেই।
সিঙ্গুর থেকে ঘাটালের দূরত্ব ১২৩ কিলোমিটার। দুটি ভিনজেলা। বুধবার দুটি মিলে গেল। মমতার দাবি, ঘাটাল মাস্টারপ্ল্যানের কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে। আর সিঙ্গুরের শিল্প? না আঁচালে বিশ্বাস নেই!