২৬ জানুয়ারি ভোর রাতে আগুন লেগেছিল আনন্দপুরের দুটো গোডাউনে। তারপর কেটে গিয়েছে তিন তিনটে দিন। এখনও চলছে উদ্ধারকার্য। বাইরে বসে নিখোঁজ শ্রমিকদের পরিবারদের লোকজন। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ২১ জনের দেহাংশ উদ্ধার হয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের খবর সামনে আসার পর থানায় মোট ২৭ জনের নামে নিখোঁজ ডায়েরি হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ২১ জনই পূর্ব মেদিনীপুরের। সেখান থেকে কলকাতায় এসেছেন নিহত ও নিখোঁজদের মা-বাবা-ভাই-বোন। প্রিয়জনের কী হল, মারা গেলে তাঁর দেহ কোথায়, নিখোঁজ থাকলে কেন খুঁজে পাওয়া গেল না, এমন হাজারো প্রশ্ন তাঁদের মনে।
আগুন নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে ঠিকই। তবে ধ্বংসস্তূপের ছাই থেকে এখনও ধোঁয়া বেরোচ্ছে। গোডাইনে ঢোকার মুখেই পাওয়া যাচ্ছে পোড়া গন্ধ। কিন্তু সব কিছুকে ছাপিয়ে আনন্দপুরের বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠেছে স্বজন হারানোর কান্নায়। নিহতের পরিবারের সদস্যদের প্রশাসনের তরফে সবরকম সাহায্যের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। ঘোষণা করা হয়েছে আর্থিক ক্ষতিপূরণও। কিন্তু টাকা পেলেই কি স্বজনের মৃত্যুকে ভোলা যায়?
এই প্রথম তো নয়। কলকাতা আগেও সাক্ষী থেকেছে এমন অনেক অগ্নিকাণ্ডের। বড়বাজারই একাধিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। তালিকায় রয়েছে আমরি হাসপাতাল, স্টিফেন কোর্ট, বাগরি মার্কেট, নন্দরাম মার্কেটের মতো জনবহুল এলাকা। তার জেরে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে। প্রতিবারই অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ ঘটনার পর সরকারের তরফে নানান আশ্বাস দেওয়া হলেও তা পালন করা হয়নি। ফলে আগুনের গ্রাসে প্রাণ হারিয়েছেন অনেকে। কারও সম্পত্তি নষ্ট হয়েছে, কেউ প্রিয়জনদের হারিয়ে সর্বশান্ত হয়েছেন।
এক নজরে কলকাতার বড় বড় অগ্নিকাণ্ড -
আমরি হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ড
২০১১ সালের এই অগ্নিকাণ্ডের ক্ষত এখনও রাজ্যবাসীর মনে দগদগে। দিনটা ছিল ৯ ডিসেম্বর। রাত আড়াইটে নাগাদ বেসমেন্টে প্রথমে আগুন লাগে। এসি ডাক্টের মাধ্যমে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে গোটা বিল্ডিংয়ে। অভিযোগ, দমকলকে ডাকা হলেও তারা অনেক দেরিতে এসে পোঁছয়। এই ঘটনায় ৯০ জনের মৃত্যু হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিলেন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগী। বিল্ডিংয়ে বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়ায় শ্বাসকষ্টে মারা যান অনেকে।
স্টিফেন কোর্ট অগ্নিকাণ্ড
২৩ মার্চ ২০১০। পার্ক স্ট্রিটের স্টিফেন কোর্ট বিল্ডিংয়ের পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলায় আগুন লাগে। শর্ট শার্কিট থেকে আগুন লেগেছিল বলে অনুমান। এই ঘটনায় ৪৩ জন প্রাণ হারান। এঁদের মধ্যে অনেকে অগ্নিদগ্ধ হয়ে আবার অনেকে শ্বাসকষ্টে মারা যান। কেউ কেউ প্রাণে বাঁচতে বহুতল থেকে ঝাঁপ দিয়েছিলেন। তার জেরে আহত হয়েছিলেন প্রায় ২০ জন।
নন্দরাম মার্কেট অগ্নিকাণ্ড
একাধিক বড় বড় অগ্নিকাণ্ডের সাক্ষী নন্দরাম মার্কেট। সূর্য সেন স্ট্রিটের এই বাজারে সব থেকে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয় ২০১৩ সালে। সেবার মারা যান ১৯ জন। এছাড়াও ২০০৮ ও ২০০৯ সালের অগ্নিকাণ্ডে কয়েক শো দোকান পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল। কোটি কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। ঘিঞ্জি এলাকা হওয়ায় দমকল ঠিকমতো পৌঁছতে পারে না ওই মার্কেটে।
মেছুয়া বাজার অগ্নিকাণ্ড
মেছুয়া বাজারে বিধ্বংসী আগুন লাগে ২০২৫ সালে। সেখানে অবস্থিত একটি হোটেলে প্রথমে আগুন লাগে। তা ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের এলাকায়। তার জেরে ১৪ জনের মৃত্যু হয়, যার মধ্যে শিশুও ছিল। একজন ব্যক্তি প্রাণ বাঁচাতে হোটেলের কার্নিশ থেকে ঝাঁপ দিয়ে মারা গিয়েছিলেন। দমকলের ১০ টি ইঞ্জিন অনেক ঘণ্টার প্রচেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছিল।