অয়ন শর্মা: সাধারণতন্ত্র দিবসের সকালে কলকাতায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। আনন্দপুরের নাজিরাবাদ রোডে বিধ্বংসী আগুন লাগে একটি কারখানার একের পর এক গোডাউনে আগুন ছড়িয়ে পড়ায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। আগুন নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে দমকলের ১২টি ইঞ্জিন। চোখের নিমেষে দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়ে আগুন। গোটা এলাকা খালি করা হয়। জানা যায়, ভোররাত ২.৩০-৩টে নাগাদ আগুন লাগে। আগুন এতটা বেশি ছড়িয়ে পড়ে তা নিয়ন্ত্রণে আনতে হিমশিম খায় দমকল বাহিনী। একটি অনলাইন স্টোরে আটকে থাকে ৪ জন ও ডেকোরেটার্সের গোডাউন থেকে আগুন ছড়িয়েছে। পরে দমকল আধিকারিক জানায় ৬ জন আটকে রয়েছে বিধ্বংসী আগুনের মধ্যে। ভোররাতে স্থানীয়রাই প্রথম দেখতে পান আগুন। তাঁরা বেরিয়ে আসেন রাস্তায়। এরপর খবর দেওয়া হয় দমকল বাহিনীকে। ভেতরে এলপিজি ব্লাস্টের নমুনা পাওয়া গেছে বলে জানা গিয়েছে। পঙ্কজ হালদার নামের এক ব্যক্তির আটকে থাকার কথা শোনা গিয়েছে। খাদ্য সামগ্রী ডেলিভারি সংস্থার গোডাউনের একটি অংশে আগুন।
আটক ডেকরেটর কোম্পানির মালিক
বিধ্বংসী আনন্দপুর অগ্নিকাণ্ডে আটক ডেকরেটরের মালিক। বারুইপুর পুলিস আটক করেছে ওই ডেকরেটর কোম্পানির মালিক গঙ্গাধরকে। দমকলমন্ত্রী সুজিত বসু এদিনই সাংবাদিক বৈঠক করে কড়া বার্তা দেন। বলেন, এই ঘটনার জন্য যে-ই দায়ি হোক, সে তার দায় এড়াতে পারে না। ওদিকে আনন্দপুর অগ্নিকাণ্ডে মৃত ৮ জনের দেহাংশ নিয়ে আসা হয়েছে কাঁটাপুকুর মর্গে। নিহতদের শনাক্ত পর্যন্ত করা যাচ্ছে না। মৃতদের শনাক্ত করতে ডিএনএ পরীক্ষা করা হচ্ছে। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হয়েছে পোড়া হাড়!
৫৯ বছর বয়সী গঙ্গাধর দাসের বাড়ি পূর্ব মেদিনীপুরের খেজুরির পূর্বচড়া গ্রামে। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ডেকরেশনের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। বছর ৪০-এর বেশি সময় ধরে তিনি ডেকরেশনের ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে। বিদেশ থেকে প্লাস্টিক ফুল নিয়ে আসা হত। ওই ফুল দিয়ে অনুষ্ঠান বাড়ি, সভা, সমিতির মঞ্চ-সহ অন্যান্য জায়গা সাজানোর কাজ হত। পূর্ব মেদিনীপুরের পাশাপাশি কলকাতার অদূরে আনন্দপুরেও গঙ্গাধর দাসের কারখানা ও গোডাউন ছিল। সেখানেই রবিবার রাতে ভয়াবহ আগুন লাগে। প্রথমে জেলায় টুকটাক ডেকরেশনের বরাত পেতেন। পরে ধীরে ধীরে ব্যবসা বাড়তে শুরু করে। প্রায় ১৩ বছর আগে পূর্ব মেদিনীপুরের পাশাপাশি কলকাতার আনন্দপুরেও এই গোডাউন চালু করেন। অগ্নিকাণ্ডের খবর প্রকাশ্যে আসার পরেই উধাও হয়ে যান গঙ্গাধর। তাঁর মোবাইল ফোনও টানা বন্ধ ছিল। তখন থেকেই গঙ্গাধরের খোঁজে তল্লাশি শুরু করে পুলিস। মঙ্গলবার নরেন্দ্রপুর থানায় তাঁর বিরুদ্ধে FIR-ও দায়ের হয়। অবশেষে মঙ্গলবার রাতে গড়িয়ার এলাচি মোড় থেকে গঙ্গাধরকে গ্রেফতার করে পুলিস।
গঙ্গাধরের দাবি
যদিও পুলিসের কাছে জেরায় গঙ্গাধর দাসের দাবি, 'মোমো তৈরির কারখানায় অবৈধভাবে কোল্ড ড্রিঙ্কস তৈরি হত। মোমো তৈরির কারখানায় মজুত দাহ্য পদার্থ থেকেই আগুন লাগে। আমার গোডাউনের পাশেই মোমোর গোডাউন ছিল। ওরা সব দাহ্য পদার্থ রাখত। ওরা লুকিয়ে CO2 দিয়ে কোল্ড ড্রিঙ্কস তৈরি করত। ওদের ওখান থেকে আগুন লাগে, পাশেই আমার গোডাউন, ওখানে লাগা আগুন আমার গোডাউনে ছড়িয়ে পড়ে। আমার ৪-৫ কোটি টাকার জিনিস পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে। আমার অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু কেউ ব্যবহার করার সময় পায়নি। সবাই ঘুমিয়ে ছিল। রাত ২টোয় আগুন লাগে। তাই ফায়ার এক্সটিংগুইশার থাকেলও সেটা কেউ ব্যবহার করতে পারেনি। সেটা এখনও সেখানে পড়ে রয়েছে।'
সাংবাদিক বৈঠকে মৃতদের পরিবারের তরফে বিস্ফোরক অভিযোগ আনা হচ্ছে-
১. রবিশ হাঁসদা- মৃত ওয়াও মোমোর কর্মী, তাঁর দাদা সুনীল হাঁসদা
২৬ তারিখ ভোর তিনটে নাগাদ ফোন করে বলে, 'আমি আর বের হতে পারব না।
আমি মরে যাব। আমাদের কোম্পানি তে আগুন লেগেছে। আমার ছোট্ট মেয়েকে দেখিস'। কেঁদে বলছেন দাদা সুনীল হাঁসদা।
দাদা কে ফোন করে জানায় আনন্দপুর অগ্নিকাণ্ডে খাক হয়ে যাওয়া ওয়াও মোমোর কর্মী রবিশ হাঁসদা। সাড়ে সাতটা নাগাদ আমি কলকাতায় আসি। ওয়াও মোমোর জয়শ্রী ম্যাডামের সঙ্গে আমার কথা হয়। ৩ জন ছিল এখানে।
আমার ভাই নিরাপত্তা রক্ষী, আর দুজন কর্মী ছিল। আরও একজন বন্ধুকে ফোন করেছিল। তাঁর স্ত্রীকে ফোন করতে পারিনি।
কেন বেরতে পারলেন না, আমার জানা নেই। নিরাপত্তা রক্ষী হলে তো গেটের কাছে থাকবে। বেরতে পারেনি কারণ ডেকরেটরস এর জিনিস পত্র মজুত ছিল। সেকারণে এক্সিট গেট দিয়ে বেরতে পারেনি।
২ থেকে তিন মিনিট কথা হয়,ওঁর সঙ্গে। ২০১৯ সাল থেকে কাজ করে এই মোমো সংস্থায়। যদি এমার্জেন্সি গেট থাকত, তাহলে বেরিয়ে যেতে পারত। ২০২৪ সালে বিয়ে হয় তাঁর। আড়াই মাসের বাচ্চাকে দেখতে হবে। এককালীন ক্ষতিপূরণ। ফায়ার সেফটি ছিলনা ফ্যাক্টরিতে- মৃত কর্মীর পরিবারের দাবি। বারুইপুর হাসপাতালে ডি এন এ টেস্ট হবে।
২. বাসুদেব হালদার - কর্মী - বারুইপুর(মৃত)
নয়ন হালদার(ছেলে), রাত ১০ টা নাগাদ ফ্যাক্টরীতে যায় বাবা। ফোন করে জানায় আমি আর ১০ মিনিট বেঁচে থাকব। গতকাল বারুইপুর হাসপাতালে ডিএন এ টেস্ট হয়েছে আমার বাবার। আগুন লাগার পর বাবা কেন বেরতে পারেনি কারণ ডেকরেটরস এর জিনিস পত্র মজুত ছিল এক্সিট গেটে।সেকারণে এক্সিট গেট থেকে বেরতে পারেনি।
৩.পঙ্কজ হালদার - কর্মী - গড়িয়া
মৌসুমী হালদার- স্ত্রী, মৃত পঙ্কজ হালদারের
রাত ৩ টা নাগাদ ফোন করে বলে,আমি বাঁচব না। এরপর ফোন কেটে যায়। আর ৫ মিনিট পর আর যোগাযোগ করা যায়নি। ওয়াও মোমো আমাদের পাশে আছে।
সিকিউরিটি গাফিলতি ছিল। তিনি ঘুমিয়ে পড়েছিলেন।
তবে ফরেনসিক পরীক্ষার প্রাথমিক রিপোর্ট বলছে, ডেকরেটারসের গুদামে রান্না হচ্ছিল। মদ্যপান চলছিল। কোনও কারণে ধূমপান বা অন্য অসাবধানতার কারণে অথবা ইকমিক স্টোভ ফেটে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। সেই আগুন আর আটকানো যায়নি। ডেকরেটারস কোম্পানির মালিক ও মোমো কোম্পানির মালিক, দুয়ের বিরুদ্ধেই গাফিলতির জেরে মৃত্যুর ধারায় অভিযোগ দায়ের হয়েছে। অন্যদিকে একই অভিযোগ ও ধারায় আরেকটি স্বতঃপ্রণোদিত মামলা রুজু করছে পুলিসও। মৃতদের পরিবার পিছু ১০ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণও ঘোষণা করা হয়েছে।