আজকাল ওয়েবডেস্ক: দেশের রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রী প্রমূখ বিশিষ্টরা বিনামূল্যে বিশ্বভারতীর রবীন্দ্রভবন সংগ্রহশালা ও ক্যাম্পাস ঘুরতে পারবেন, আর সেই অনুমতি দিচ্ছেন বিশ্বভারতীর উপাচার্য! এমনই এক বিজ্ঞপ্তিকে কেন্দ্র করে শান্তিনিকেতনে তীব্র বিতর্ক ও শোরগোল শুরু হয়েছে। আশ্রমিক, প্রাক্তনী এবং সংস্কৃতিমনস্ক মহলের একাংশের মতে, এই বিজ্ঞপ্তি শুধুমাত্র বিতর্কিত নয়, বরং চরম অবমাননাকর ও অসম্মানজনক।
বিশ্বভারতীর কর্মসচিবের জারি করা গত ২৭ জানুয়ারির ওই বিজ্ঞপ্তিতে মোট ১০৬ জন পদাধিকারীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে, যাঁরা বিনামূল্যে রবীন্দ্রভবন সংগ্রহশালা ও বিশ্বভারতী ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে পারবেন। তালিকায় রয়েছে ভারতের রাষ্ট্রপতি, উপ-রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী, পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল, মুখ্যমন্ত্রী-সহ একাধিক শীর্ষ সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক পদাধিকারী। বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, উপাচার্যের অনুমতিক্রমেই তাঁদের বিনামূল্যে প্রবেশের ছাড় দেওয়া হচ্ছে।
এই বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ্যে আসতেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করে, দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তিদের প্রবেশের জন্য আলাদা করে অনুমতি দেওয়ার প্রয়োজন আদৌ আছে কি না। আশ্রমিক ও প্রাক্তনীদের একাংশের বক্তব্য, রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী বিশ্বের কোথাও গেলে প্রবেশমূল্য দিতে হয় এমন উদাহরণ কারও জানা নেই। সেক্ষেত্রে তাঁদের নাম লিখে বিনামূল্যে প্রবেশের অনুমতির বিজ্ঞপ্তি জারি করা কার্যত তাঁদের মর্যাদাকেই খাটো করা।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, বিশ্বভারতীর নিজস্ব আইন ও বিধি অনুযায়ী ভারতের রাষ্ট্রপতি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিদর্শক, প্রধানমন্ত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য এবং পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল হলেন প্রধান। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, এই পদাধিকারীদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার ক্ষমতা উপাচার্য বা কর্মসচিবের হাতে রয়েছে কি না, তা নিয়েও জোরালো প্রশ্ন উঠছে। অনেকের মতে, যাঁরা পদাধিকার সূত্রেই বিশ্বভারতীর সর্বোচ্চ অভিভাবক, তাঁদের নাম তালিকাভুক্ত করে অনুমতি দেওয়া প্রশাসনিক সীমা লঙ্ঘনের শামিল।
প্রসঙ্গত, রবীন্দ্রভবন সংগ্রহশালা বরাবরই সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য টিকিট কেটে দেখার ব্যবস্থা রয়েছে। ২০২৩ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ইউনেস্কো বিশ্বভারতীকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের স্বীকৃতি দেওয়ার পর সম্প্রতি পর্যটকদের জন্য নির্দিষ্ট টিকিট মূল্যে 'হেরিটেজ ওয়াক' চালু হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ে পর্যটকরা বিশ্বভারতী ক্যাম্পাস ঘুরে দেখার সুযোগ পাচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে শীর্ষ পদাধিকারীদের জন্য বিনামূল্যে প্রবেশের পৃথক তালিকা প্রকাশ হওয়ায় ক্ষোভ আরও বেড়েছে।
বিশ্বভারতীর পক্ষ থেকে অবশ্য এই বিজ্ঞপ্তিকে সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই পড়ে বলে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষের দাবি, ভিভিআইপিদের ক্ষেত্রে বিনামূল্যে প্রবেশের বিধান রয়েছে এবং সাধারণ দর্শনার্থীদের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয় বলেই এই বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। তবে এই ব্যাখ্যায় আশ্রমিক ও প্রাক্তনীদের বড় অংশ সন্তুষ্ট নন।
শান্তিনিকেতনের প্রবীণ আশ্রমিক ও ঠাকুর পরিবারের সদস্য সুপ্রিয় ঠাকুর বলেন, দেশের সাংবিধানিক প্রধানদের প্রবেশে কোনও বাধা থাকে না। তাঁদের নাম আলাদা করে বিনামূল্যে প্রবেশের অনুমতির তালিকায় তুলে ধরা অত্যন্ত অশোভনীয়। শান্তিনিকেতন ট্রাস্ট ও আশ্রম সমাজের প্রতিনিধিরাও মনে করছেন, এই বিজ্ঞপ্তি বিশ্বভারতীর ঐতিহ্য, মর্যাদা ও আত্মসম্মানের পরিপন্থী।
সব মিলিয়ে, বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষের জারি করা এই বিজ্ঞপ্তি এখন শান্তিনিকেতনের চায়ের আড্ডা থেকে সাংস্কৃতিক মহল— সর্বত্রই আলোচনার কেন্দ্রে। অনেকেরই মত, এটি নিছক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং দেশের শীর্ষ সাংবিধানিক পদগুলির মর্যাদা নিয়ে এক অপ্রয়োজনীয় ও বিতর্কিত অবস্থান। যদিও এই প্রসঙ্গে বিশ্বভারতীর ভারপ্রাপ্ত জনসংযোগ আধিকারিক অতিগ ঘোষ বলেন, "এটা সংবিধানের মধ্যেই পরে। আমরা ভিভিআইপিদের বিনামূল্যে প্রবেশ করতে দেব। বাকিদের নয়৷ তারজন্যই বিজ্ঞপ্তি দেওয়া।"