নয়াদিল্লি: সোনার পাথরবাটি! উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জাতপাতের ভিত্তিতে বৈষম্য রোধে সম্প্রতি নয়া বিধি এনেছিল বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। তীব্র বিতর্ক ও প্রতিবাদের আবহে বৃহস্পতিবার তাতে স্থগিতাদেশ জারি করল সুপ্রিম কোর্ট। নয়া বিধিতে সাধারণ বা অসংরক্ষিত শ্রেণিকে বাদ রেখেই যেভাবে শুধুমাত্র সংরক্ষিত শ্রেণির পড়ুয়াদের অভিযোগ গ্রহণে ‘ইক্যুইটি কমিটি’ গড়ার মতো প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে আদতে ‘বিভাজন’ই দেখছে শীর্ষ আদালত। ইউজিসির নয়া বিধির সাংবিধানিক বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করে পেশ হয়েছিল একাধিক আবেদন। সেই সব আর্জির শুনানিতে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত ও জয়মাল্য বাগচীর বেঞ্চ এদিন বলেছে, প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে নয়া বিধি ‘অস্পষ্ট’। এর ‘অপব্যবহারের’ আশঙ্কাও রয়েছে। তীব্র ভর্ৎসনার সুরে শীর্ষ আদালতের মৌখিক পর্যবেক্ষণ, আমরা হস্তক্ষেপ না করলে সমাজে এর ভয়ংকর প্রভাব পড়তে পারে। আরও বাড়তে পারে বিভাজন। প্রধান বিচারপতির বাক্যবাণ, ‘স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরেও আমরা কি এমন সমাজের দিকে এগোচ্ছি, যা উলটে জাতিগত বৈষম্যের পথেই ফিরে যাচ্ছে? বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার লক্ষ্যে এতদিন আমরা যা অর্জন করেছি, তার সবটাই কি ধুলোয় মিশে যাবে?’বিভিন্ন শ্রেণির পড়ুয়াদের জন্য পৃথক হস্টেলের যে সুপারিশ করা হয়েছে, তা নিয়েও তোপ দেগেছে সুপ্রিম কোর্ট। বলা হয়েছে, ‘ভগবানের দোহাই, এমনটা করবেন না! আমরা তো সবাই একসঙ্গেই থাকতাম।’ প্রধান বিচারপতির বেঞ্চের আরও বক্তব্য, বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে নয়া বিধিগুলির পুনর্বিবেচনা করতে হবে। সেই সূত্রেই ইউজিসি ও কেন্দ্রীয় সরকারকে নোটিসও ইস্যু করেছে শীর্ষ আদালত। নয়া বিধিতে স্থগিতাদেশ জারি করে আরও জানানো হয়েছে, আপাতত ২০১২ সালের পুরানো বিধিগুলিই জারি থাকবে। আগামী ১৯ মার্চের মধ্যে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলিকে নিজেদের বক্তব্য পেশ করতে হবে।২০১৬ সালের ১৭ জানুয়ারি আত্মঘাতী হন হায়দরাবাদ কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দলিত গবেষক ছাত্র। নাম রোহিত ভেমুলা। অভিযোগ ওঠে, নিম্নবর্ণের ছাত্র হওয়ায় লাগাতার হেনস্তা ও বৈষম্যের শিকার হয়েই চরম পথ বেছে নিয়েছিলেন তিনি। ভেমুলার আত্মহত্যা দেশজুড়ে শিক্ষাঙ্গনে প্রতিবাদের ঝড় তুলেছিল। শুধু তাই নয়, খোদ ইউজিসির পরিসংখ্যানই দেখাচ্ছে, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জাতপাতের বৈষম্যের ঘটনা প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। আর তাই ভেমুলার মৃত্যুর ঠিক এক দশক পর ক্যাম্পাসে জাতপাতের নামে বৈষম্য রোধে চলতি মাসেই নয়া বিধি আনে ইউজিসি। যদিও ‘প্রোমোশন অব ইক্যুইটি ইন হায়ার এডুকেশন ইনস্টিটিউশনস, ২০২৬’ নামে এই নয়া বিধির বিরুদ্ধে অচিরেই শুরু হয় প্রতিবাদ। অভিযোগ ওঠে, নয়া বিধিতে শুধুমাত্র এসসি, এসটি, ওবিসিদের জন্য ‘প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা’র ব্যবস্থা করা হয়েছে। শুধুমাত্র তাঁদের তোলা অভিযোগ গ্রহণ করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ‘ইক্যুইটি কমিটি’ গড়ার কথা বলা হয়েছে। ক্যাম্পাসে সাধারণ শ্রেণি বা ‘উচ্চবর্ণে’র অসংরক্ষিত পড়ুয়ারা হেনস্তার শিকার হলে তার প্রতিকার কে করবে? এমনকি অভিযুক্তদের আত্মপক্ষসমর্থনের সুযোগ পর্যন্ত নেই নয়া বিধিতে। প্রতিবাদে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে স্লোগান তুলেছেন উত্তরপ্রদেশের সাবর্ণ আর্মি। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ছাত্র সংগঠনেরও দাবি, ইউজিসির এই নয়া বিধিও বৈষম্যকর। অবিলম্বে তা প্রত্যাহার করে সম্পূর্ণ বিভাজনহীন বিধি আনতে হবে। বাংলার শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসুর প্রতিক্রিয়া, সুপ্রিম কোর্ট ফের কেন্দ্রের চাপিয়ে দেওয়া মনোভাব আটকে দিল। মুখ্যমন্ত্রী বারবার বলেছেন, এ ধরনের বিধি চালু করার আগে রাজ্যগুলির সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। সেই বক্তব্যের যথার্থতাই ফের প্রমাণিত হল।