• তীব্র জলসঙ্কটের মুখে বাংলা-সহ ১৭ রাজ্য, ইঙ্গিত অ্যাকোয়াডাক্ট ওয়াটার রিস্ক অ্যাটলাস–এ
    এই সময় | ৩০ জানুয়ারি ২০২৬
  • কুবলয় বন্দ্যোপাধ্যায়

    জানুয়ারি শেষ হওয়ার আগেই অস্তিত্ব জানান দিতে শুরু করেছে গরম। ক্যালেন্ডারের তোয়াক্কা না–করেই মধ্য মাঘে কলকাতার রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় দেড় ডিগ্রি বেড়ে গিয়েছে। আবহবিদরা আগে থেকেই শুনিয়ে রেখেছেন, প্রশান্ত মহাসাগরের উত্তপ্ত জলতলের সৌজন্যে (এল নিনো) এ বছর ভারতীয় উপমহাদেশ রীতিমতো চড়া গরম পেতে চলেছে। একই সঙ্গে তুলনামূলক ভাবে কম বৃষ্টির আশঙ্কাও খুব বেশি। এমন পরিস্থিতিতে আরও একটি দুশ্চিন্তার ইঙ্গিত মিলল অ্যাকোয়াডাক্ট ওয়াটার রিস্ক অ্যাটলাস–এর রিপোর্টে। এই রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বের যে ৩৮টি শহর অতি উচ্চ জলসঙ্কটের মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে, তার মধ্যে নাম রয়েছে রাজধানী নয়াদিল্লির। দুশ্চিন্তার এখানেই শেষ নয় — রিপোর্ট অনুযায়ী দেশের ২৮টি রাজ্য ও আটটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মধ্যে বাংলা–সহ ১৭টি রাজ্যই জলসঙ্কটের নিরিখে ‘হাই রিস্ক জ়োন’–এ রয়েছে।

    ‘গ্লোবাল ওয়াটার ব্যাঙ্করাপ্টসি’ — গত ২০ জানুয়ারি এমনই একটি শব্দবন্ধের প্রয়োগ করেছে রাষ্ট্রপুঞ্জ। সংগঠন জানাচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তন এবং একই সঙ্গে ভূগর্ভস্থ জলের অনিয়মিত এবং অবৈজ্ঞানিক ব্যবহার এবং বিপুল জনসংখ্যার চাপের ফলে বিশ্বের বহু জায়গাতেই ক্রমশ পানীয় জলের পরিমাণ কমতে কমতে শূন্যের দিকে এগোতে শুরু করেছে। এই তালিকায় ইতিমধ্যেই নাম তুলে ফেলেছে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবান, আফগানিস্তানের কাবুল এবং ভারতের চেন্নাই। এই তিনটি শহরই অন্তত একদিনের জন্য হলেও ‘ডে জ়িরো’ বা জলহীন দিবসের অভিজ্ঞতা হয়েছে। এ হলো এমন একটা সময় যখন একটা গোটা দিন শহরে পানীয় জলের কোনও জোগান দেওয়া যায়নি। জলবায়ুবিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, টানা ছ’বছর খরার ফলে ইরানের রাজধানী তেহরান এখন ‘ডে জিরো’–র দুয়ারে দাঁড়িয়ে। এখানকার জলাশয়গুলো জলশূন্য হয়ে পড়েছে।

    পরিস্থিতি এমন জায়গায় গিয়েছে যে রাজধানী তেহরান থেকে সরিয়ে দেশের দক্ষিণ প্রান্তের মাকরান–এ নিয়ে যাওয়ার ভাবনাচিন্তা শুরু হয়েছে। জলবায়ুবিজ্ঞানীরা কোনও রাখঢাক না–করেই জানাচ্ছেন, বিশ্বের অর্ধেক বড় শহরই বর্তমানে তীব্র জলসঙ্কটে ভুগছে। এই শহরগুলোর মধ্যে নাম রয়েছে দিল্লি, বেজিং, নিউ ইয়র্ক, লস অ্যাঞ্জেলেস, রিও ডি জেনেইরো, এমনকী লন্ডনও। নাম রয়েছে জাকার্তা এবং ব্যাঙ্ককেরও। সমীক্ষা বলছে এই শহরগুলোয় ১১০ কোটির বেশি মানুষের বসবাস। এ ছাড়াও পৃথিবীতে প্রায় ৪০০ কোটি মানুষ অর্থাৎ বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেককেই বছরে অন্তত এক মাস তীব্র জলসঙ্কটে ভুগতে হচ্ছে।

    যে জায়গাগুলোয় জলসঙ্কটের সমস্যা বিশেষ ভাবে প্রকট, তার মধ্যে আফ্রিকার সাহারা মরুভূমি–সংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকা এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ায় দেশগুলো। এদের মধ্যে উত্তর ভারত এবং পাকিস্তানে ভৌম জলস্তর শুকিয়ে যাওয়ার প্রবণতা খুবই বেশি। সবচেয়ে চিন্তার বিষয় হলো ভারতের মধ্যে গঙ্গা–যমুনা দোয়াব অঞ্চলের অর্থাৎ গাঙ্গেয় অববাহিকার অবস্থা অত্যন্ত সঙ্গীন। অ্যাকোয়াডাক্ট ওয়াটার রিস্ক অ্যাটলাস–এর রিপোর্ট বলছে, বাংলা ছাড়াও ভারতের যে রাজ্যগুলো জলসঙ্কটের মুখেই দাঁড়িয়ে রয়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছে জম্মু ও কাশ্মীর, পাঞ্জাব, হরিয়ানা, রাজস্থান, উত্তর প্রদেশ, ছত্তিসগড়, বিহার, ওডিশা, গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, কর্টনাক, তেলঙ্গানা, অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ু এবং কেরালা।

    রিপোর্ট অনুযায়ী গঙ্গার অববাহিকায় দেশের ৪৫ শতাংশ মানুষের বসবাস। এই এলাকা থেকে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৪৪ শতাংশ আসে এবং দেশের ২৫ শতাংশ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এখানেই অবস্থিত। রিপোর্টে এশিয়ার যে ১০টি প্রধান নদীর প্রোফাইল ধরে পরিস্থিতির বিশ্লেষণ করা হয়েছে, তাদের মধ্যে গঙ্গা অন্যতম। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য ভারত তার গাঙ্গেয় সমভূমি থেকে প্রতিদিন কয়েক মিলিয়ন গ্যালন জল তুলছে। এর পাশাপাশি তো দ্রুত বদলাতে থাকা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আছেই। সব মিলিয়ে অন্তত ৬৫ কোটি মানুষের জীবন এবং কয়েক বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি আপাতত সামনের কয়েক মাস প্রাকৃতির বৈরিতার মুখোমুখি। কারণ ২০২৫–এর মতো এ বছরও যদি ফেব্রুয়ারি থেকেই দেশে তাপপ্রবাহ দেখা দেয়। তা হলে জুন পর্যন্ত চার মাস জলের চাহিদা আকাশছোঁয়া হতে চলেছে। সুতরাং ভৌম জলস্তরের ভাণ্ডার শেষ হওয়ার মধ্যে আশ্চর্যের কিছুই নেই।

    ওয়াটার রিস্ক অ্যাটলাস–এর রিপোর্ট অনুযায়ী ভারতে প্রতি দিন মাথাপিছু গড়ে ১৩৫ লিটার করে জল প্রয়োজন হয়। গাঙ্গেয় অববাহিকায় পানীয় জলের প্রধান উৎসই হলো গঙ্গা ও তার শাখা ও উপনদীর জল এবং বৃষ্টির জল। যদি পূর্বাভাস মতো এ বছর বৃষ্টি পরিমাণ কম থাকে, তা হলে তার পরিণতি কী হতে পারে ভাবতেই ভয় হয়। গঙ্গা ছাড়াও ভারতের ব্রহ্মপুত্র ও সিন্ধু–কে ‘হাই রিস্ক’ তালিকায় রাখা হয়েছে। বাকি নদীগুলোর মধ্যে রয়েছে, আমু দরিয়া, ইরাবতী, মেকং, সালউইন, তারিম, ইয়াংজ়ি এবং ইয়েলো রিভার।

  • Link to this news (এই সময়)