• অস্থিমজ্জা-টুথ পাল্পে জানা যাবে ২৮ জনের পরিচয়?
    এই সময় | ৩০ জানুয়ারি ২০২৬
  • অনির্বাণ ঘোষ

    বোনম্যারো বা অস্থিমজ্জা এবং টুথ পাল্প বা দাঁতের ভিতরের নরম শাঁসালো অংশ— আনন্দপুর নাজ়িরাবাদের গুদাম থেকে উদ্ধার হওয়া পুড়ে আংরা হয়ে যাওয়া শরীরগুলোর এই দু’টি জায়গাতেই রয়ে গিয়েছে হারানো পরিচয়ের চাবিকাঠি। তাপনিরোধক বর্মের কারণে শরীরের এই দু’টি অঙ্গের অন্দরমহলে অক্ষত অবস্থায় মিলতে পারে ডিএনএ। তাই সেখান থেকেই নমুনা সংগ্রহ করার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে ২১টি দেহাংশের। প্রতিটি থেকে দু’টি হিসেবে মোট ৪২টি নমুনা বুধ ও বৃহস্পতিবার সংগ্রহ করা হয়েছে কাঁটাপুকুর মর্গে।

    সেই নমুনাগুলি থেকে তৈরি করা হবে ডিএনএ প্রোফাইল। যার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে দাবিদার পরিবারের সরাসরি ও নিকটতম সম্পর্কের সদস্যের রক্তের মধ্যে থাকা ডিএনএ প্রোফাইলকে। তার জন্য নিকটাত্মীয়দের রক্তের নমুনা বুধবারই সংগ্রহ করা হয়েছে বারুইপুর মহকুমা হাসপতালে। ২৮ জন নিখোঁজ ব্যক্তির ডিএনএ প্রোফাইল ম্যাচিংয়ে সেন্ট্রাল ফরেন্সিক সায়েন্সেস ল্যাবরেটরি (সিএফএসএল)-র কমপক্ষে তিন সপ্তাহ সময় লাগতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কেননা, প্রতিটি দেহাংশের ডিএনএ প্রোফাইলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে ২৮টি নিখোঁজ ব্যক্তির নিকটাত্মীয়ের ডিএনএ, যা অল্প সময়ে সম্ভব নয়।

    তবে চেষ্টা করা হচ্ছে ‘নিখোঁজ’দের ব্যবহার করা টুথ ব্রাশ এবং ‘এক্সক্লুসিভ’ ব্যবহার করা চিরুনির উপর। তাতে আটকে থাকা এপিথেলিয়াল কোষের থেকে তৈরি করা হবে ডিএনএ প্রোফাইল। এবং নিখোঁজ ও মৃত ব্যক্তির সেই ডিএনএ হুবহু মিলিয়ে দেখে চেষ্টা করা হবে পরিচয় জানার। যদিও ফরেন্সিক মেডিসিনের প্রবীণ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অজয় গুপ্ত জানাচ্ছেন, প্রবল তাপে ওই মৃতদেহগুলির যা অবস্থা, তাতে দেহাংশগুলি থেকে ডিএনএ প্রোফাইলিং করার জন্য নমুনা সংগ্রহ করা বেশ দুষ্কর। কেননা, দেহাংশগুলি মূলত টুকরো কঙ্কাল— হাড়, খুলি ও দাঁতের টুকরোর মিশেল। তাতে অবশিষ্ট নেই এতটুকু মাংস কিংবা দেহরস, যে সফট বা লিক্যুইড টিস্যু থেকে সহজে মিলতে পারে ডিএনএ বিশ্লেষণের নমুনা।

    ঠিক যেমনটা হয়েছিল ২০১০-এর ২৩ মার্চ স্টিফেন কোর্ট অগ্নিকাণ্ডের ক্ষেত্রে। সে বারও পুড়ে প্রায় কাঠকয়লা হয়ে গিয়েছিল দেহগুলি। রয়েছে একাধিক ব্যক্তির নমুনা মিশে গিয়ে তৈরি হওয়া ‘কন্টামিনেশন’-এর ঝঞ্ঝাটও, ঠিক যেমনটা দেখা গিয়েছিল ওই বছরই ২৮ মে ঘটা জ্ঞানেশ্বরী ট্রেন দুর্ঘটনায়। তবে চিকিৎসকদের একাংশ জানাচ্ছেন, হাড় ও দাঁতের উপরিভাগে থাকে অত্যন্ত কঠিন তাপনিরোধক বর্ম— যথাক্রমে পেরিয়োস্টিয়াম ও এনামেল। তাই বোনম্যারো ও টুথ পাল্পের মধ্যে থেকে সংগ্রহ করা টিস্যু ডিএনএ বিশ্লেষণের জন্য উৎকৃষ্ট নমুনা।

    বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এনামেল যেহেতু শরীরের কঠিনতম টিস্যু, তাই ১০০ থেকে ১৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় টুথ পাল্পের মধ্যেকার জৈব-রাসায়নিকগুলি পুরোপুরি অক্ষত থাকে। পেরিয়োস্টিয়ামের কারণে অস্থিমজ্জাও তা-ই। ২০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত অস্থিমজ্জা ও টুথ পাল্পের উপাদানের এমন কোনও ক্ষতি হয় না, যা থেকে ডিএনএ বিশ্লেষণ সম্ভব নয়। উপাদান নষ্ট হতে অন্তত ৩০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস প্রয়োজন। গুদামে আগুন লাগার ক্ষেত্রে তাপমাত্রা যদিও প্রায় ৬০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠতে পারে, কিন্তু সেই উচ্চ তাপমাত্রা দমকল কাজ শুরুর পরে বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। সে জন্যই দেহ ও দেহাংশের এই দু’টি অংশ থেকেই নমুনা নেওয়া শ্রেয়।

    জ্ঞানেশ্বরী ট্রেন দুর্ঘটনার পর অসংখ্য মৃতদেহের পরিচয় উদ্ধার করার জন্য ১১৪টি দেহ ও দেহাংশের ডিএনএ স্যাম্পলিং করেছিলেন ফরেন্সিক মেডিসিনের যে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, সেই সোমনাথ দাস বলছেন, ‘অস্থিমজ্জা ও দাঁতের পাল্পের নমুনা থেকে তৈরি ডিএনএ প্রোফাইলের সঙ্গে ১০০% ম্যাচিংয়ের চেষ্টা করা হয় প্রথমে। তার জন্য দরকার মৃত বা নিখোঁজ ব্যক্তির ডিরেক্ট স্যাম্পল, যা পাওয়া যেতে পারি মৃতের ব্যবহৃত টুথব্রাশ বা চিরুনি থেকে। যেহেতু টুথব্রাশ একান্ত নিজেরই এবং ব্রাশ করার সময় প্রতিদিনই মাড়ির সংস্পর্শে থাকা অদৃশ্য এপিথেলিয়াল কোষগুলি ব্রাশের ব্রিসলের গায়ে লেগে থাকে, তাই সেখান থেকে ডিএনএ ম্যাচিং করে তা ১০০% মেলানো সম্ভব।’

    তবে সোমনাথের বক্তব্য, ‘ডিরেক্ট স্যাম্পল না পেলেও ইনডিরেক্ট স্যাম্পল দিয়েও পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব।’ তিনি জানান, প্রথমে মৃতের দেহ বা দেহাংশ থেকে ডিএনএ প্রোফাইল তৈরি করা হয়। তার পরে যাঁরা যাঁরা এই মৃতদেহগুলিকে নিজেদের আত্মীয় বলে দাবি করছেন, তাঁদের রক্তের নমুনা থেকে ডিএনএ প্রোফাইলিং করা হয়। ওই চিকিৎসকের কথায়, ‘ইনডিরেক্ট স্যাম্পলের ক্ষেত্রে ‘ফার্স্ট ডিগ্রি ব্লাড রিলেশন’-কেই গ্রাহ্য মানা হয়। অর্থাৎ, বাবা, মা, ভাই, বোন, ছেলে, মেয়ে। সবচেয়ে ভালো বাবা-মা। কারণ, আমাদের শরীরের প্রায় সব কোষের মধ্যে যে ২৩ জোড়া করে ক্রোমোজ়োম থাকে, সেগুলির সঙ্গে বাবা কিংবা মায়ের ক্রোমোজ়োমের অন্তত ৯৫% থেকে ৯৭% মিল পাওয়া যায়।’

  • Link to this news (এই সময়)