হুমায়ুন আহমেদ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বা আনিসুজ্জামানেরা কি নিরাপদ কলকাতায়? রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও খেতে আসেননি-খ্যাত মোহম্মদ নাজিমউদ্দিন বা বাংলাদেশের জনপ্রিয় তরুণী কলম ইলমা বেহরোজ় কি ছাড়পত্র পেয়েছেন?
প্রশ্নগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে বাংলাদেশহীন কলকাতা বইমেলায়। এবং উত্তর ঠিক ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলা যাবে না। কারণ, প্রকাশক এবং বই বিক্রেতা তথা পাবলিশার্স অ্যান্ড বুক সেলার্স গিল্ডের সাধারণ সম্পাদক ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায়ের কথায়, ‘‘ভূ-রাজনৈতিক কারণে এই মুহূর্তে বাংলাদেশ আমাদের বইমেলায় নেই, এটা ঘটনা। আবার এটাও ঠিক যে, বইয়ের পাতায় নানা ভাব, নানা মত, নানা লেখক— কিছুই বইমেলায় নিষিদ্ধ নয়।’’
চোরা ভয়, শঙ্কাও মালুম হচ্ছে কান পাতলে। একাধিক স্টলকর্তা বলছেন, গিল্ড বলে দিয়েছে, ‘বাংলাদেশের বিপুল বইয়ের সম্ভার’ কথাটা কোথাও লেখা যাবে না। অর্থাৎ, হুমায়ুনের হিমু, মিসির আলি বা ইলিয়াসের ওসমান বইমেলা থেকে নির্বাসিত না-হলেও থাকছেন কিছুটা সন্তর্পণেই। বড় প্রকাশক দে’জ়-এর শুভঙ্কর দে বলছেন, ‘‘কলেজ স্ট্রিটে আমরাও বাংলাদেশের বই রাখি। কিন্তু বইমেলায় নয়। কারণ, ঢাকার একুশে মেলায় ওঁরা আমাদের ডাকেন না।’’
শুভঙ্করদের সহযোগী ‘কমলিনী’র স্টলে কিন্তু ক্যালিফর্নিয়ার দিশারীর সঙ্কলন ‘ধ্বনি’-র পাতায় ভারত, বাংলাদেশ, আমেরিকা, কানাডা— নানা দেশের বাঙালিদের লেখার সহাবস্থান। ভিরাসত আর্ট থেকে ‘ধানমন্ডি ৩২ ও মুজিবের দেশে মীরজ়াফরেরা’ বইটিও মেলায় প্রকাশিত হল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড-সহ স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে সাড়া ফেলে দেওয়া যাবতীয় ষড়যন্ত্রেরসাতকাহন এই বই। সাংবাদিক অমল সরকারের কলমে ফুটে উঠেছে সেই সব আখ্যান।
তাই কে বলে বাংলাদেশ নেই এ বইমেলায়? দীর্ঘ দিন ধরে বাংলাদেশের বই বিক্রেতা, ‘নয়া উদ্যোগ’-এর পার্থসারথি বসু সাদাত হোসেন থেকে আবু ইশহাকের ধ্রুপদী লেখার কাটতি লক্ষ করেছেন। হুমায়ুন থেকে তরুণী ইলমার জনপ্রিয়তায় চমৎকৃত বিশ্ববঙ্গীয় প্রকাশনের কাজী হাসান। তিনি আক্ষেপ করছিলেন, ‘‘ডামাডোলে এ বার আর বই আনতে নিজে বাংলাদেশে যাইনি। হাতে আর একটু বই থাকলে, বেশি ভাল হত।’’
‘অভিযান’-এর মারুফ হোসেন সমান তালে দুই বাংলার লেখকদের লেখাই প্রকাশ করেন। বললেন, ‘‘আমাদের সব থেকে জনপ্রিয় লেখক মোহম্মদ নাজিমউদ্দিনই! অন্য বারের থেকে ভাল বিক্রি হচ্ছে।’’
দু’দেশের সম্পর্কের ছন্দপতনের ছায়াও এড়াতে পারেনি বই প্রকাশ জগৎ। লিরিক্যালের সুমেরু মুখোপাধ্যায় বলছিলেন, ‘‘দুই বাংলার বেকারিনামা আর মাছের বাজার নিয়ে বই করতে পারিনি, ও দেশের কয়েক জন লেখক পিছিয়ে যাওয়ায়। বইয়ের অন্যতম সম্পাদক ঢাকার এক জন সাংবাদিক। তাঁকে ও-দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কয়েক জন লেখক জানান, এখনই কলকাতার প্রকাশনার জন্য লিখতে চাইছেন না। ফলে বইগুলো এ বার হল না।’’
প্রাণের টানে তবু কলকাতা বইমেলায় ঘুরে গিয়েছেন ঢাকার পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্সের কামরুল হাসান শায়ক। বাতিঘরের দীপঙ্কর দাশও আসছেন। দু’জনেই প্রত্যয়ী, এ সবই সাময়িক টানাপড়েন। সংস্কৃতির ভাঙা সেতু অচিরে জোড়া লাগবে। দুই বাংলা শিগ্গিরই মিলে যাবে বইমেলার মাঠে।