• বিরিয়ানির লোভে মুখ্যমন্ত্রীর সভায় পড়ুয়ারা! প্রশ্ন উঠছে রাজ্য শিশু সুরক্ষা কমিশনের নীরবতা নিয়ে
    এই সময় | ৩০ জানুয়ারি ২০২৬
  • এই সময়, সিঙ্গুর: আর পাঁচটা দিনের মতোই বুধবার নির্ধারিত সময়েই স্কুলে পৌঁছে গিয়েছিল হুগলির নালিকুল দেশবন্ধু বাণীমন্দির স্কুলের পড়ুয়ারা। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা জানতে পারে, আজ আর কাউকে ক্লাস করতে হবে না। তার বদলে তাদেরকে নিয়ে যাওয়া হবে মুখ্যমন্ত্রীর সভায়। যারা মিটিংয়ে যাবে, তাদেরকে দেওয়া হবে একটা করে বিরিয়ানির প্যাকেট। বিরিয়ানির কথা শুনে লোভ সংবরণ করতে পারেনি অনেকেই। তাছাড়া শিক্ষকদের নির্দেশ তো অমান্য করা যায় না। তাই কোনও পড়ুয়াই আর আপত্তি করেনি।

    মহা আনন্দে বুধবার দুপুরে সিঙ্গুরে মুখ্যমন্ত্রীর মিটিং শুনতে চলে গিয়েছিল পড়ুয়ারা। বাসে ওঠার সময়ে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয় সরকারি প্রকল্পের প্ল্যাকার্ড। বিকেলে স্কুল ছুটি হওয়ার সময় সন্তানদের আনতে গিয়ে অভিভাবকরা সে কথা জানতে পারেন। তারপরই প্রধান শিক্ষককে ঘিরে ধরে শুরু হয় বিক্ষোভ। সেই ভিডিয়ো (ছবির সত্যতা যাচাই করেনি এই সময়) ভাইরাল হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়াতেও। তা নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক। প্রশ্ন উঠছে, অভিভাবকদের না জানিয়ে স্কুলের ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের মুখ্যমন্ত্রীর সভায় নিয়ে যাওয়াটা কতটা যুক্তিপূর্ণ। এই ইস্যুতে রাজ্য শিশু সুরক্ষা কমিশনের নীরবতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

    বুধবার সকালে যথারীতি স্কুলের ইউনিফর্ম পরেই বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল নালিকূল দেশবন্ধু বাণীমন্দির স্কুলের অষ্টম শ্রেণির এক পড়ুয়া। ছেলের বাড়ি ফিরতে দেরি হওয়ায় বিকেল ৩টে নাগাদ স্কুলে ছোটেন মা নবনীতা সুরুল। ততক্ষণে স্কুলে রীতিমতো ভিড় জমে গিয়েছে। অভিভাবকরা স্কুলের প্রধান শিক্ষক গদাধর বাড়ইকে ঘিরে রেখেছেন। ছেলেকে স্কুলে দেখতে না পেয়ে প্রধান শিক্ষকের উপরে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন সবাই। প্রত্যেকেরই একটাই প্রশ্ন, অভিভাবকদের না জানিয়ে কেন মুখ্যমন্ত্রীর মিটিংয়ে বাচ্চাদের নিয়ে যাওয়া হলো?

    নবনীতার কথায়, 'আমার ছেলে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। সকালে নির্ধারিত সময়েই স্কুলে এসেছে। পরে জানতে পারি, আমার ছেলে-সহ অষ্টম শ্রেণির পড়ুয়াদের বাসে করে মুখ্যমন্ত্রীর সভায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ওদেরকে যে মিটিংয়ে নিয়ে যাবে, সেটা আমাদেরকে আগাম জানানো হয়নি।' আর এক অভিভাবক বললেন, 'সকালে ভাত না খেয়েই ছেলে স্কুলে এসেছিল। বিকেল হয়ে গেলেও ছেলে বাড়ি না ফেরায় খুব চিন্তা হচ্ছিল। পরে আসল ঘটনাটা জানতে পারি। এটা করা একেবারেই উচিত হয়নি।' অভিভাবকদের একের পর এক প্রশ্নবাণে রীতিমতো বিদ্ধস্ত লাগছিল প্রধান শিক্ষককে। মোবাইল হাতে নিয়ে অসহায়ের মতো মাথা নিচু করে বসেছিলেন।'

    পরে অবশ্য স্কুলের প্রধান শিক্ষক গদাধর বারুই সংবাদমাধ্যমকে বলেন, 'একদম শেষ মুহূর্তে নির্দেশ এসেছিল। তাই অভিভাবকদের জানানোর সুযোগ পাইনি। প্রশাসনের নির্দেশ অনুযায়ী এটা আমাদের এটা করতে হয়েছে। অভিভাবকদের ক্ষোভ হওয়াটা স্বাভাবিক।' মুখ্যমন্ত্রীর সভাস্থল ভরাতে কেন নাবালক পড়ুয়াদের নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। তাতে তিনি লিখেছেন, 'লজ্জা হয়, যখন দেখা যায়, বাচ্চা বাচ্চা ছাত্রছাত্রীদেরও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের রাজনৈতিক সভা ভরাতে ব্যবহার করছেন।'

    জেলা প্রশাসনের এক শীর্ষ কর্তার সাফাই, 'সিঙ্গুরে মুখ্যমন্ত্রীর সরকারি অনুষ্ঠান ছিল। সেখানে বিভিন্ন সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা, যারা বিভিন্ন ধরনের সুবিধা পেয়ে থাকে, শুধুমাত্র তাদেরকেই নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।' যদিও হুগলির একাধিক স্কুলের প্রধান শিক্ষকরা জানিয়েছেন, জেলা স্কুল শিক্ষা দপ্তর থেকে তাঁদেরকে মৌখিক ভাবে বলা হয়েছিল, বাচ্চাদের নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর সভায় যেতে হবে। তার বিনিময়ে বিরিয়ানির প্যাকেট দেওয়া হবে। এ ব্যাপারে কোনও লিখিত নির্দেশ ছিল না। মুখ্যমন্ত্রীর প্রশাসনিক সভায় সাধারণত আশাকর্মী, আইসিডিএস কর্মী এবং স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলাদের উপস্থিতি চোখে পড়ে।

    কিন্তু স্কুলের পড়ুয়াদের নিয়ে যাওয়ার রেওয়াজ খুব একটা নেই। তা হলে সিঙ্গুরে মুখ্যমন্ত্রীর সভায় স্কুল পড়ুয়াদের নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ল কেন? জেলা প্রশাসনের এক শীর্ষ কর্তার ব্যাখ্যা, গত বেশ কিছুদিন ধরেই আশাকর্মীদের লাগাতার আন্দোলন চলছে। আইসিডিএস কর্মীরাও বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে আন্দোলনে নেমেছেন। তাই মুখ্যমন্ত্রীর সভায় আশাকর্মীদের নিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি নেয়নি পুলিশ। তাঁদের জায়গায় স্কুল পড়ুয়াদের নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এর প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার চুঁচুড়া পিপুলপাতি ডিআই অফিসের সামনে বিক্ষোভ দেখান বিজেপি কর্মী-সমর্থকরা। ইট দিয়ে দরজা ভাঙার চেষ্টা হয়। শিক্ষা ভবনের নাম কেটে তৃণমূল ভবন করে দেয় বিজেপি। পরে চুঁচুড়া থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি সামাল দেয়।

    এ ব্যাপারে সিঙ্গুরের বিধায়ক মন্ত্রী বেচারাম মান্না বলেন, 'উপভোক্তা ছাত্রদের নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এর সঙ্গে রাজনীতির কোনও যোগ নেই। ছাত্রদের ভোটাধিকার নেই। আসলে সিঙ্গুরে মানুষের জমায়েত দেখে বিজেপি ভয় পেয়ে ছাত্রদের নিয়ে রাজনীতি করছে।' পুরশুড়ার বিজেপি বিধায়ক বিমান ঘোষ বলেন, 'তৃণমূল সভায় লোক আনতে পারছে না বলে স্কুলের বাচ্চাদের নিয়ে যেতে হচ্ছে। এর জন্য ওদের ধিক্কার জানাই।' এ ব্যাপারে রাজ্য শিশু সুরক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান তুলিকা দাস বলেন, 'কী ভাবে এই ঘটনা ঘটল, আমরা তা খতিয়ে দেখছি।'

  • Link to this news (এই সময়)