জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের রেশ কেটে গিয়েছে অনেকদিন। রাজ্য এখন ভবিষ্যতের রাজনীতির দিকে তাকাচ্ছে। ২০২৬ এর বিধানসভা (West Bengal Assembly Election 2026) ভোট এখন দোরগোড়ায়। ভোটের দামামা বাজছে রাজ্য জুড়ে। সঙ্গে গোদের উপর বিষফোঁড়া এসআইআর (SIR in Bengal)। ২০২৫ এর নভেম্বর থেকে রাজ্যে এই SIR-এর জন্য প্রাণ গিয়েছে প্রায় ৫০-এরও বেশি মানুষের। দেশান্তরী হওয়ার ভয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছে বহুলোক। কিন্তু দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গেরুয়া রঙের আধিপত্য। বিহারে সম্প্রতি বিপুল ভোটে জিতেছে বিজেপি। রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, গুজরাট, ওড়িশাতেও ঘর ঘর মোদি ক্যাম্পেনের জয়জয়কার। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল-বিজেপি একদম আদায়-কাঁচকলায়, বিশেষ করে এসআইআরের চোটে রাজ্য রাজনীতি প্রবল উত্তপ্ত। এই আবহে সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে একটি সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমের সি ভোটার (C-Voter Survey) সমীক্ষার ফলাফল। এই সমীক্ষা অনুযায়ী, যদি আজই বিধানসভা নির্বাচন হয়, তবে বঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস (TMC) ২০২৪ সালের মতোই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় জিতবে। তবে সামান্য হলেও নিজেদের জমি পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দিচ্ছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি BJP)।
২০২৪ বনাম ২০২৬: আসনের সমীকরণ
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস সবাইকে চমকে দিয়ে ৪২টি আসনের মধ্যে ২৯টিতে জয়লাভ করেছিল। অন্যদিকে, ২০১৯-এর তুলনায় ফল খারাপ করে বিজেপি মাত্র ১২টি আসনে থমকে গিয়েছিল।
সাম্প্রতিক ২০২৬-এর সমীক্ষা বলছে:
তৃণমূল কংগ্রেস: বর্তমান সমীক্ষায় তৃণমূলের আসন সংখ্যা ২৯ থেকে সামান্য কমে ২৮টি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।
বিজেপি: বিজেপির আসন সংখ্যা ১২ থেকে কিছুটা বেড়ে ১৪টি হতে পারে বলে আভাস দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য যে, গত আগস্ট মাসে করা একই সমীক্ষায় বিজেপির আসন সংখ্যা ১১-তে নেমে যাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। সেই তুলনায় এবারের সমীক্ষায় বিজেপির পালে কিছুটা হাওয়া লেগেছে বলে মনে করা হচ্ছে। অন্যদিকে, আগস্টের সমীক্ষায় তৃণমূলের আসন ৩১ পর্যন্ত হতে পারে বলে জানানো হলেও, বর্তমান পরিস্থিতিতে তা তিন আসন কমিয়ে ২৮ করা হয়েছে।
মেরুকরণ ও দ্বিমুখী লড়াইয়ের ইঙ্গিত
সি-ভোটার-এর প্রতিষ্ঠাতা-পরিচালক যশবন্ত দেশমুখের মতে, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি ক্রমশ একটি 'বাইপোলার' বা দ্বিমুখী লড়াইয়ের দিকে এগোচ্ছে। বাম এবং কংগ্রেসের প্রাসঙ্গিকতা ক্রমশ ফিকে হয়ে আসায় লড়াই মূলত তৃণমূল এবং বিজেপির মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। সমীক্ষায় আরও দেখা যাচ্ছে যে, রাজ্যে রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও তীব্র হয়েছে।
বিগত কয়েকটি সমীক্ষার দিকে তাকালে এই পরিবর্তনের চিত্রটি পরিষ্কার হয়:
ফেব্রুয়ারি ২০২৪: তখন ভাবা হয়েছিল তৃণমূল ২২টি এবং বিজেপি ১৯টি আসন পাবে।
আগস্ট ২০২৪: লোকসভা নির্বাচনের পরবর্তী সেই সমীক্ষায় তৃণমূলকে ৩২টি এবং বিজেপিকে মাত্র ৮টি আসন দেওয়া হয়েছিল।
বর্তমান সমীক্ষা (২০২৬): এখন তৃণমূল ২৮ এবং বিজেপি ১৪-তে দাঁড়িয়ে আছে।
জাতীয় প্রেক্ষাপট বনাম পশ্চিমবঙ্গ
দেশজুড়ে ১.২৫ লক্ষ মানুষের ওপর গত আট সপ্তাহ ধরে চালানো এই সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, জাতীয় স্তরে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ (NDA) জোট ৩৫০-র বেশি আসন নিয়ে ক্ষমতায় ফিরতে পারে। কিন্তু জাতীয় স্তরে বিজেপির এই বিপুল আধিপত্য থাকলেও পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের দুর্গে বড় কোনও ফাটল ধরাতে তারা এখনই সফল হচ্ছে না। আঞ্চলিক দল হিসেবে তৃণমূলের প্রাসঙ্গিকতা এবং বাংলার মানুষের কাছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গ্রহণযোগ্যতা যে এখনও অটুট, এই সমীক্ষা তারই প্রমাণ।
পর্যালোচকদের দৃষ্টিভঙ্গি
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরণের সমীক্ষা সবসময় শতভাগ সঠিক না-ও হতে পারে (take with a pinch of salt), তবে এটি জনমতের একটি সাধারণ প্রবণতা তুলে ধরে। সমীক্ষাটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে:
১. তৃণমূল কংগ্রেস তাদের গ্রামীণ ভোটব্যাঙ্ক এবং মহিলা ভোট ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
২. বিজেপি তাদের সংগঠন কিছুটা গুছিয়ে নিয়ে হারানো দুই-তিনটি আসন ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছে।
৩. কংগ্রেস বা বামফ্রন্টের জন্য এই সমীক্ষা খুব একটা আশাব্যাঞ্জক নয়, কারণ লড়াইটি স্পষ্টভাবে দুই মেরুতে বিভক্ত হয়ে গিয়েছে।
বলা যায়, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তৃণমূল কংগ্রেস এখনও চালকের আসনেই বসে আছে। ২০২৪ সালের জয়ের ধারা বজায় রেখে তারা নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করে চলেছে। অন্যদিকে, বিজেপি কিছুটা শক্তি বাড়িয়ে ১৪টি আসনের দিকে এগোলেও, তারা তৃণমূলের বড় কোনো ক্ষতি করতে পারছে না। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই সমীক্ষা, রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা এবং রণকৌশল সাজানোর রসদ হিসেবে কাজ করবে।