অয়ন ঘোষাল: আনন্দপুরকাণ্ডে গ্রেফতারি বেড়ে ৩। পুষ্পাঞ্জলি ডেকরেটর সংস্থার মালিক গঙ্গাধর দাসের পর এবার মোমো কোম্পানির দুই আধিকারিককে গ্রেফতার করল নরেন্দ্রপুর থানা। ধৃতরা হলেন কোম্পানির ম্যানেজার মনোরঞ্জন শিট এবং ডেপুটি ম্যানেজার রাজা চক্রবর্তী। ধৃত দুজনকেই আজ বারুইপুর মহকুমা আদালতে পেশ করা হয়। ওদিকে মৃতের সংখ্যাও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫-এ।
গত রবিবার রাতের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর সময় যত এগোচ্ছে, ততই দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। আনন্দপুরের নাজিরাবাদ এলাকায় ভস্মীভূত কারখানার ধ্বংসস্তূপ সরাতেই বেরিয়ে আসছে একের পর এক দগ্ধ দেহ। বৃহস্পতিবার সারাদিনে উদ্ধার হয় আরও চারজনের দেহ। ফলে এই বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ডে মৃতের সংখ্যা একলাফে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫-এ। স্বজনহারাদের আর্তনাদে এখনও ভারাক্রান্ত গোটা এলাকা। বুধবার রাত পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ছিল ২১। এরপর বৃহস্পতিবার ভোররাতে দুটি এবং বিকেলের দিকে আরও দুটি দগ্ধ দেহাবশেষ পাওয়া যায়। পুলিস সূত্রে খবর, উদ্ধার হওয়া দেহাবশেষ এতটাই ভস্মীভূত যে সাধারণ চোখে শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব।
ইতিমধ্যেই ১৬ জনের দেহ ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। নিখোঁজদের নিকটাত্মীয়দের থেকে এখনও পর্যন্ত ভ্যারিয়েবল ডিএনএ স্যাম্পলিং বা নমুনা সংগ্রহ হয়েছে ৩২টি। স্টেট ফরেনসিক প্যাথলজি সেগুলিকে ম্যাপিং করছে। কলকাতার বুকে অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যুর ঘটনায় একমাত্র স্টিফেন কোর্টের পর আনন্দপুরেই প্রয়োজন পড়ল ডিএনএ ম্যাপিং-এর। ২৫ জনের মধ্যে এখনও পর্যন্ত মাত্র একটি প্রায় পূর্ণাঙ্গ দেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তাকে প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে বলে পুলিস সূত্রে খবর। ওই ব্যক্তির শরীরের প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পুড়ে গেলেও, তাঁর পরনের পোশাক দেখে অনুমান করা হচ্ছে তিনি ওই মোমো প্রস্তুতকারক সংস্থার কর্মী। বয়স আনুমানিক ৪৫ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে। যদিও ওই ব্যক্তির পরিবার এখনও নিশ্চিতভাবে দেহটি শনাক্ত করেনি। তাই ওই দেহটিও ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।
কীভাবে হচ্ছে ডিএনএ ম্যাপিং?
১) যে সমস্ত নিকটাত্মীয় নিখোঁজ ডায়েরি লিখিয়েছেন তাঁদের রক্তের নমুনা এবং দেহরসের নমুনা (লালারস) সংগ্রহ করা হয়েছে।
২) এখনও পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া সকল দেহ/দেহাবশেষ থেকে করোটির দাঁত, হাড়ের ভিতর থাকা বোন ম্যারো (অস্থি মজ্জা) থেকে সংগৃহীত নমুনার সঙ্গে আত্নীয়দের নমুনা মাইক্রো স্ক্যানারে ম্যাপিং করা হবে।
৩) উদ্ধারের প্রথমদিকে বিষয়টি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না থাকায় অনেকক্ষেত্রে প্যাকিং (বস্তাবন্দি করার) পদ্ধতিতে কিছু ভুলত্রুটি থেকে গিয়েছিল। কয়েকটি ক্ষেত্রে আলাদা করে বোঝার অসুবিধা থাকায় কাছাকাছি থাকা দুটি দেহাবশেষ বা হাড়গোড় একসঙ্গে প্যাক করা হয়েছে বলে স্টেট ফরেনসিক ল্যাব সূত্রে খবর। সেগুলির ক্ষেত্রে ডিএনএ ম্যাপিং বেশ কিছুটা সময় সাপেক্ষ।
৪) ম্যাপিংয়ে নির্ভুল বৈজ্ঞানিক পন্থা অবলম্বন করা হচ্ছে। স্টিফেন কোর্ট অগ্নিকাণ্ডে মোট মৃত (৪৩)-এর থেকে বেশি ক্লেইম করা হয়েছিল। এবার তাই অতিরিক্ত সতর্কতা এবং সাবধানতা অবলম্বন করে হাতে সময় নিয়ে ম্যাপিংয়ের কাজ এগোচ্ছে।
৫) কলকাতার বুকে অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যুর ঘটনায় একমাত্র স্টিফেন কোর্টে ডিএনএ ম্যাপিংয়ের প্রয়োজন পড়েছিল। তারপর আবার আনন্দপুরে ডিএনএ ম্যাপিং-এর প্রয়োজন পড়ল। ঢাকুরিয়া আমরিতে ৯১ জনের মৃত্যু হলেও কোনও দেহ এইভাবে সম্পূর্ণ ঝলসে যাওয়ার ঘটনা ঘটেনি।
৬) বড়বাজার মেছুয়া পট্টির হোটেলের ক্ষেত্রেও দেহ এইভাবে ঝলসে খন্ড-বিখন্ড হয়ে যায়নি। কারণ ওই দুটি ক্ষেত্রেই মৃত্যুর কারণ ছিল বিষাক্ত কার্বন যুক্ত ধোঁয়া। কিন্তু স্টিফেন কোর্ট এবং আনন্দপুর অগ্নিকাণ্ডে সরাসরি আগুনে দেহ পুড়ে খাক হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।