পিয়ালি মিত্র: আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের দামামা বাজার আগেই রাজ্যের পুলিস প্রশাসনে এক বিশাল রদবদল ঘটাল নবান্ন। বৃহস্পতিবার রাজ্য ও কলকাতা পুলিসের শীর্ষ স্তর থেকে শুরু করে থানা পর্যায়ের ইনস্পেক্টর পর্যন্ত একযোগে বদলি করা হয়েছে। এই রদবদলের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো কলকাতার পুলিস কমিশনার পদে সুপ্রতিম সরকারের আগমন এবং রাজ্য পুলিশের অস্থায়ী ডিজি হিসেবে পীযূষ পান্ডের নিয়োগ।
দেখতে গেলে, ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে রাজ্য পুলিস প্রশাসনের খোলনলচে বদলে দিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। শীর্ষ আইপিএস অফিসারদের রদবদলের পাশাপাশি ১০৯ জন ইনস্পেক্টর পদমর্যাদার আধিকারিককেও বদলি করা হয়েছে।
কলকাতার নতুন পুলিস কমিশনার সুপ্রতিম সরকার
দীর্ঘদিন পর কলকাতা পুলিস একজন আপাদমস্তক বাঙালি কমিশনার পেল। মনোজ ভার্মাকে সরিয়ে সুপ্রতিম সরকারকে লালবাজারের শীর্ষ পদে আনা হয়েছে। দক্ষ প্রশাসক হিসেবে পরিচিত সুপ্রতিম সরকার একসময় বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের অত্যন্ত আস্থাভাজন ছিলেন এবং বর্তমান সরকারের আমলেও রাজীব কুমারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে, মনোজ ভার্মাকে পাঠানো হয়েছে ডিরেক্টর সিকিউরিটি পদে।
রাজ্য পুলিশের শীর্ষ পদে পরিবর্তন
রাজ্য পুলিসের ডিজি পদ থেকে রাজীব কুমার ৩১ জানুয়ারি অবসর নিচ্ছেন। তাঁর জায়গায় অস্থায়ী ডিজি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সিনিয়র আইপিএস অফিসার পীযূষ পান্ডেকে। এ ছাড়া, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এডিজি (আইনশৃঙ্খলা) পদে ফেরানো হয়েছে বিনীত গোয়েলকে। আরজি কর কাণ্ডের পর জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলনের চাপে তাঁকে কলকাতার পুলিশ কমিশনার পদ থেকে সরিয়ে এডিজি (এসটিএফ) করা হয়েছিল।
সুপ্রিম কোর্টে মামলার প্রভাব?
রাজনৈতিক মহলের ধারণা, ৩ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্টে আই-প্যাক মামলার শুনানির আগেই কৌশলে এই রদবদল সেরে রাখা হলো। উল্লেখ্য, এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) মনোজ ভার্মা ও রাজীব কুমারের বিরুদ্ধে তদন্তে বাধা দেওয়ার অভিযোগে তাঁদের সাসপেন্ড করার আবেদন জানিয়েছিল। শুনানির আগেই রাজীব কুমারের অবসর এবং মনোজ ভার্মার বদলি রাজ্য সরকারকে আইনি দিক থেকে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রাখতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
ইনস্পেক্টর ও আইসি পর্যায়ে বদলি
১. শীর্ষস্তরের পাশাপাশি নিচুতলার পুলিস প্রশাসনেও বড় রদবদল করা হয়েছে। নবান্নের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ১০৯ জন ইনস্পেক্টরকে বদলি করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন গঙ্গারামপুর, দার্জিলিং সদর, এবং আমডাঙার মতো গুরুত্বপূর্ণ থানার আইসি-রা।
২. দার্জিলিং সদরের আইসি শুভ্র সান্যালকে পশ্চিম মেদিনীপুরের কোতোয়ালি থানায় পাঠানো হয়েছে।
৩. আমডাঙার আইসি রাজকুমার সরকারকে নাকাশিপাড়ার সার্কেল ইনস্পেক্টর করা হয়েছে।
৪. গঙ্গারামপুরের আইসি-কে দুর্নীতি দমন শাখায় (এসিবি) বদলি করা হয়েছে।
ভোটের আগে পুলিসের এই ধরনের রদবদল প্রশাসনিক স্তরে স্বাভাবিক হলেও, সময়ের নিরিখে এটি যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। একদিকে সুপ্রিম কোর্টের আইনি চাপ মোকাবিলা, অন্যদিকে নির্বাচনের আগে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা—এই দুই লক্ষ্যেই নবান্ন এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চাইল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।