বরুণ সেনগুপ্ত: ব্যারাকপুরের বিরিয়ানির স্বাদ বিশ্বজুড়ে সমাদৃত, কিন্তু সেই স্বাদ ছাপিয়ে এখন আলোচনায় উঠে এল এক তিক্ত পারিবারিক নোংরামি। জনৈক প্রসিদ্ধ বিরিয়ানি ব্যবসায়ীর ‘ঘরোয়া কেচ্ছা’ এখন পৌঁছে গিয়েছে থানা থেকে আদালতের চৌকাঠে। পরকীয়া, চুরির অভিযোগ এবং প্রকাশ্য রাস্তায় স্ত্রীকে মারধরের নাটকীয়তায় এখন সরগরম উত্তর ২৪ পরগনার বিরিয়ানি সাম্রাজ্য।
ব্যারাকপুর মানেই ভোজনরসিকদের কাছে বিরিয়ানির স্বর্গরাজ্য। কিন্তু সেই সুখ্যাতির আড়ালে যে সম্পর্কের এমন কঙ্কালসার চেহারা লুকিয়ে ছিল, তা ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি কেউ। মধ্যমগ্রামের ‘অনির্বাণ বিরিয়ানি’র মালিক অনির্বাণ দাসের পারিবারিক বিবাদ এখন জনসমক্ষে। স্ত্রীকে মারধর এবং ড্রাইভারের সঙ্গে পালানোর চেষ্টার মিথ্যে অভিযোগ আনায় পুলিস একদিকে যেমন ব্যবসায়ী অনির্বাণকে গ্রেফতার করেছে, অন্যদিকে শ্রীঘরে ঠাঁই হয়েছে তাঁদের গাড়িচালক সমীর সেনেরও।
অভিযোগের পাহাড়: চালকের সঙ্গে পালানোর ছক?
ঘটনার সূত্রপাত ব্যবসায়ী অনির্বাণ দাসের করা একটি অভিযোগকে কেন্দ্র করে। অনির্বাণের দাবি, তাঁর স্ত্রী শ্রমনা (মতান্তরে সুমনা) দাস পরিবারের বিপুল পরিমাণ সোনাদানা নিয়ে তাঁদেরই গাড়িচালক সমীর সেনের সঙ্গে চম্পট দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। অনির্বাণের অভিযোগ অনুযায়ী, শ্রমনা এবং সমীর প্রথমে দিঘা ও পুরী ঘুরে এসে মুম্বই পালানোর ছক কষেছিলেন।
ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, গোপন সূত্রে খবর পেয়ে তিনি বিমানবন্দর যাওয়ার আগেই তাঁদের ধরে ফেলেন। এরপরই এয়ারপোর্ট থানার পুলিশ অভিযুক্ত চালক সমীর সেনকে আটক করে এবং পরে মোহনপুর থানার পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। অনির্বাণের দাবি, চালক তাঁর স্ত্রীকে ফুঁসলিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন।
১৭ বছরের নির্যাতনের অভিযোগ
নাটকের এখানেই শেষ নয়। স্বামীর অভিযোগের পাহাড়ের বিপরীতে দাঁড়িয়ে বিস্ফোরক দাবি করেছেন শ্রমনা দাস। তাঁর সাফ কথা, বিয়ের পর দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে তিনি অনির্বাণের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করেছেন। শ্রমনার বক্তব্য, 'অত্যাচারের সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ও আমাকে মারধর করে হাত ভেঙে দিয়েছে। তাই ঠিক করি আর ওর সাথে থাকব না।'
সোনা চুরির অভিযোগও উড়িয়ে দিয়েছেন শ্রমনা। তাঁর প্রশ্ন, 'আমার বাবা আমাকে যে সোনা দিয়েছিলেন, সেগুলো কি অন্যের? আমার নামে সোনার অজস্র বিল আছে।' চালকের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়েও তিনি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন। তাঁর দাবি, তিনি দিঘা বা পুরী যেতেই পারেন, কিন্তু তা চালকের সঙ্গে ছিল কি না, তা প্রমাণ করার দায় অনির্বাণের। শ্রমনার হুঁশিয়ারি, 'আমি মুখ খুললে ও পালাবার পথ পাবে না।'
থানার সামনেই হাতাহাতি: গ্রেফতার দুজনেই
শুক্রবার সকালে মোহনপুর থানার সামনে এক নজিরবিহীন দৃশ্য দেখা যায়। পুলিস ও সাধারণ মানুষের সামনেই রাগের মাথায় স্ত্রী শ্রমনার চুলের মুঠি ধরে মারধর এবং চড় মারেন অনির্বাণ। পুলিসের সামনেই এই ‘বউ-পেটানো’র কাণ্ড দেখে উপস্থিত সকলে হতভম্ব হয়ে যান। নিজের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কিত শ্রমনা তৎক্ষণাৎ পুলিসের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
স্ত্রীর সেই অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিস দ্রুত পদক্ষেপ নেয় এবং ব্যবসায়ী অনির্বাণ দাসকে গ্রেফতার করে। একইসঙ্গে চুরির অভিযোগে গ্রেফতার করা হয় গাড়িচালক সমীর সেনকেও।
সমাজমাধ্যমে শোরগোল ও আইনি জটিলতা
কয়েক মাস আগেই এই বিরিয়ানি ব্যবসায়ীর পারিবারিক ঝামেলার কথা সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল। কিন্তু সেই ব্যক্তিগত বিবাদ যে থানার চৌকাঠ পেরিয়ে জেল হেফাজত পর্যন্ত গড়াবে, তা কেউ ভাবেনি। বিরিয়ানি-খ্যাত ব্যারাকপুরে এখন আলোচনার কেন্দ্রে হান্ডির সুগন্ধ নয়, বরং সম্পর্কের তিক্ততা।
পুলিস জানিয়েছে, অনির্বাণ দাস এবং সমীর সেন— দু’জনকেই শুক্রবার বারাকপুর আদালতে তোলা হয়েছে। ঘটনার নেপথ্যে অন্য কোনও রহস্য রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করেছে মোহনপুর ও এয়ারপোর্ট থানার পুলিস। আপাতত বিরিয়ানি ব্যবসায়ীর এই ঘরোয়া লড়াই আদালত কক্ষের চার দেওয়ালে বন্দি হতে চলেছে।