‘গোপন’ তথ্য আর প্রকাশ নয়, আরটিআই আইনেও লাগাম কেন্দ্রের?
বর্তমান | ৩১ জানুয়ারি ২০২৬
নয়াদিল্লি: ‘কোনো প্রশ্ন নয়’—লালমোহনবাবুর মাত্রাতিরিক্ত কৌতূহলে বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন ফেলুদা। সোনার কেল্লার সেই অমর সংলাপটি ভোলার নয়। ঠিক সেভাবেই এবার গোটা দেশের মুখেই তর্জনি সেঁটে দেওয়ার চেষ্টা শুরু হল! সদ্য সংসদে পেশ করা মোদি সরকারের অর্থনৈতিক সমীক্ষার সুপারিশ ঘিরে এমনই অভিযোগ তুলছে বিরোধীরা। কারণ, সমীক্ষা রিপোর্টে দু’দশকের পুরানো তথ্যের অধিকার আইন (আরটিআই) নিয়ে পুনর্বিবেচনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। জানানো হয়েছে, গোপনীয় তথ্য নিয়ে ‘অহেতুক কৌতূহলে’ রাশ টানার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। অহেতুক বাড়তি তথ্যের প্রকাশ প্রশাসনিক কাজের গতিকে থমকে দিচ্ছে। তাই সুনির্দিষ্ট কিছু গোপন নথি ও সরকারি কর্তাদের আলোচনার খসড়া ২০০৫-এর ওই আইনের আওতার বাইরে আনা যেতে পারে। বিরোধীদের দাবি, আদতে এই অছিলায় নাগরিকদের তথ্য জানার সাংবিধানিক অধিকারে লাগাম পরাতে চাইছে কেন্দ্র।নাগরিকদের তথ্য জানার অধিকারকে স্বীকৃতি দিতেই মনমোহন সিংয়ের নেতৃত্বাধীন প্রথম ইউপিএ সরকার আইনটি তৈরি করেছিল। প্রধান লক্ষ্য ছিল দুর্নীতি রোধ এবং সরকারি কাজে স্বচ্ছতা-দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন তৃতীয় এনডিএ সরকার সেই আরটিআই আইনকেই ধীরে ধীরে ঠুঁটো করে দিতে চাইছে বলে সরব বিরোধী শিবির। শুক্রবার কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়্গের তোপ, মনরেগার পর এবার কি আরটিআই আইনের খুন হওয়ার পালা?২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী পদে বসার পর থেকেই সাংবাদিক সম্মেলন এড়িয়ে চলেছেন নরেন্দ্র মোদি। এবার তথ্যের অধিকার আইনেও লাগাম পরানোর ইঙ্গিত সামনে আসায় সরব বিরোধী শিবির। এক্স হ্যান্ডলে খাড়্গে তাই মুণ্ডপাত করেছেন মোদি সরকারের। লিখেছেন, ‘অর্থনৈতিক সমীক্ষায় আরটিআই আইন খতিয়ে দেখার দাবি জানানো হয়েছে। তথ্য প্রকাশ ঠেকাতে মন্ত্রীদের হাতে ভেটো ক্ষমতা তুলে দেওয়ার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। শুধুমাত্র গত বছরেই ২৬ হাজারের বেশি আরটিআই আবেদনের জবাব মেলেনি। ২০২৩ সালের ডিজিটাল পার্সোনাল ডেটা প্রোটেকশন আইনে গোপনীয়তা রক্ষার অছিলায় দুর্নীতিকে ঢাকার কৌশল নেওয়া হয়েছে। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত মুখ্য তথ্য কমিশনার পদ ফাঁকা ছিল। বিগত ১১ বছরে এই নিয়ে সপ্তমবার এমনটা হল। আসলে মোদি সরকার আরটিআই আইনকে পরিকল্পনামাফিক দুর্বল করে দিয়েছে।’আর্থিক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, অহেতুক কৌতূহল নিরসন বা সরকারি কাজকে বাইরে থেকে নিয়ন্ত্রণ করা কখনোই আইনটির উদ্দেশ্য ছিল না। সব খসড়া বা ফাইলের নোট প্রকাশ হয়ে যাবে—এই ভয়ে সরকারি কর্তারা যাতে অভ্যন্তরীণ বৈঠকে মতামত প্রকাশে পিছিয়ে না আসেন, তা নিশ্চিত করা দরকার। তাই প্রকল্প চূড়ান্ত রূপ না পাওয়া পর্যন্ত সেই সংক্রান্ত অন্তর্বর্তী তথ্য গোপন রাখার পক্ষে সওয়াল করা হয়েছে। যদিও খাড়্গের তোপ, ২০১৪ সাল থেকে শতাধিক তথ্যাধিকার কর্মীকে খুন হতে হয়েছে। এমন ভীতির পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে যেখানে বিরুদ্ধমত এবং সত্যান্বেষীদের শাস্তি অনিবার্য। এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রের জায়গায় লালমোহনবাবু থাকলে হয়তো বলে উঠতেন, ‘তাং মাত করো...!’