• ত্রিপল আর তারের জঙ্গলে বড়বাজার জতুগৃহই
    আনন্দবাজার | ৩১ জানুয়ারি ২০২৬
  • চিত্র ১: নন্দরাম মার্কেটের অদূরে ব্রেবোর্ন রোডের ফুটপাত। প্লাস্টিক আর পলিথিনের ছাউনির উপরে স্তূপীকৃত প্লাস্টিক। ফুটপাত বলে যে কিছু রয়েছে, বোঝাই যাবে না। সেই ফুটপাতের উপরে দেদার ব্যবসা চলছে প্লাস্টিক কিংবা কাপড়ের জিনিসের।

    চিত্র ২: নন্দরাম মার্কেটের গায়ে যমুনালাল বজাজ বাজারের ভিতরের ত্রিপলপট্টির খুপরি রাস্তা দিয়ে চলতে গেলেই মনে হবে, এ সব চত্বরে অগ্নিকাণ্ডের তোয়াক্কা করেন না ব্যবসায়ীরা। বাজারের ভিতরে সর্বত্রই ত্রিপলের রমরমা কারবার। কোনও কোনও জায়গায় জড়ো করে রাখা হয়েছে ত্রিপলের বড় বড় রোল।

    চিত্র ৩: বাগড়ি মার্কেটের বাইরে বহাল তবিয়তে প্লাস্টিকের সামগ্রী-সহ চলা ডালার ব্যবসা ফুটপাত ও প্রধান রাস্তার অর্ধেকের বেশি দখল করে রেখেছে। ব্যস্ত সময়ে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে দমকল কী ভাবে সেখানে ঢুকবে, সেই ভাবনা ভাবতে রাজি নন কেউই।

    ফায়ার অডিট কী বস্তু, তা যেন জানেনই না বড়বাজার তল্লাটে ব্যবসা করা সিংহভাগ রাস্তার ব্যবসায়ী। বৃহস্পতিবার দুপুরে এজ়রা স্ট্রিট, ক্যানিং স্ট্রিট, নেতাজি সুভাষ রোড কিংবা ব্রেবোর্ন রোডের উপরে অস্থায়ী দোকানের কয়েক জন ব্যবসায়ীর সঙ্গে ‘ফায়ার অডিট’ প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে মনে হল, শব্দটি তাঁরা প্রথম বার শুনছেন। কেউ কেউ তো বলেই বসলেন, ফায়ার অডিট বড় বড় বাজারের দোকানের জন্য।

    নন্দরাম, বাগড়ি কিংবা মেছুয়ার মতো এলাকায় গত দেড় দশকে একাধিক বড় অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। ২০১৮ সালে বাগড়ি মার্কেট যখন পুড়ে যায়, তখন প্রশাসন অভিযোগ করেছিল যে, বাগড়ির গেট আটকে ছিল ডালা ব্যবসায়ীদের জন্য। যে কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজ শুরু করতে দেরি হয়। ২০২৬ সালে নরেন্দ্রপুরের নাজিরাবাদে অগ্নিকাণ্ডে অনেকের মৃত্যুর পরে সেই বাগড়ি বাজারের সামনে গিয়ে দেখা গেল, বিশৃঙ্খলা আর অব্যবস্থার পরিবর্তন হয়নি। রাস্তা জুড়ে দাহ্য বস্তুর ব্যবসা চলছে। বাগড়ি মার্কেটের ভিতরের ব্যবসায়ীরা জানালেন, ২০১৮ সালের দুর্ঘটনার পরে তাঁরা ভিতরে দেড় লক্ষ লিটারের জলের ট্যাঙ্ক, হোসপাইপ-সহ আগুন নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করেছেন।

    বাজারের সম্পাদক পিনাকী কেশরীর দাবি, ‘‘সাম্প্রতিক অতীতে উল্টো দিকে বৈদ্যুতিন সরঞ্জামের ব্যবসা চলে, এমন একটি বাড়িতে আগুন লেগেছিল। আমাদের এখান থেকেই জল দিয়ে তা নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। বাজারের বাইরের রাস্তা নিয়ে নতুন করে কী বলব? সবাই সবটা দেখছেন।’’

    বাগড়ির দুর্ঘটনার সময়ে দমকল তথা প্রশাসনের তরফে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়েছিল, পাকা বাজারগুলিতে পর্যাপ্ত অগ্নি-নির্বাপক রাখতে হবে। সেই বাগড়ি মার্কেটের পাশে রামপুরিয়া বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, জলের তেমন ব্যবস্থা এখনও নেই। কিছু বালি রাখার পাত্র এবং অগ্নি-নির্বাপক আছে। কিন্তু সে সবের ব্যবহার তাঁরা জানেন না বলেই জানালেন ব্যবসায়ীরা। নন্দরাম মার্কেটের পরিস্থিতি তুলনায় অনেকটা ভাল হলেও বহুতল ওই বাজারের কোনও কোনও তলের ভিতরের সরু রাস্তা মালপত্র জড়ো হয়ে থাকায় আরও সঙ্কীর্ণ হয়ে রয়েছে। যদিও প্রতিটি তলেই দেখা গিয়েছে হোসপাইপ-সহ অগ্নি-নির্বাপণব্যবস্থা।

    নেতাজি সুভাষ রোড, এজ়রা স্ট্রিট, ক্যানিং স্ট্রিট-সহ মধ্য কলকাতার বড়বাজার চত্বর ঘুরে দেখা গেল, ত্রিপল আর তারের জঙ্গল সর্বত্র। ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন, দশকের পর দশক ধরে এটাই চলছে। তাঁদের দাবি, বাণিজ্যস্থল এমনই হয়। আগুন লাগলে দমকল আসে। দমকলের ঘটনাস্থলে পৌঁছতে কোনও সমস্যা হয় না। দমকলের লালবাজার শাখা জানাচ্ছে, তারা সময়ে সময়ে অগ্নিকাণ্ডের বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বড়বাজার চত্বরে সচেতনতা শিবির করে। কিন্তু সেই বার্তা কতটা প্রতিফলিত হয়, বড়বাজার চত্বর ঘুরলে সেই প্রশ্ন উঠতে বাধ্য।

    দমকলের ডিজি রণবীর কুমারের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, এই সমস্যার সমাধান কী? তিনি এ নিয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাননি।
  • Link to this news (আনন্দবাজার)