• আসল বিষয় জনসংযোগ ও মিষ্টি কথা, স্মার্ট বইমেলার ছত্রে ছত্রে তারই প্রমাণ
    বর্তমান | ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • বিশ্বজিৎ দাস, কলকাতা: বইমেলার শেষ শনিবার। বোতলখোলা কোল্ড ড্রিংকসের ফেনার মতো ভিড়। বিকেল সাড়ে চারটে মোটে। ১ নম্বর গেটের কাছে খাবারের প্যাভিলিয়নে রসিকদের ভিড়। ঢিলছোড়া দূরে অল্পবয়সি এক যুবক বায়োস্কোপের হ্যান্ডেল ঘোরাচ্ছেন। মুখে মিষ্টি কথা—‘ম্যাডাম, একবার ট্রাই করেই যান না। হ্যাঁ, স্যার, দারুণ ব্যাপার কিন্তু। না দেখলেই মিস!’ তরুণের মিষ্টি কথা এবং বায়োস্কোপের টান—দুইয়ের প্যাকেজ দর্শকদের টেনে নিয়ে আসছে স্টলে।কয়েক হাত যেতে না যেতেই শ্রীরামকৃষ্ণ এবং সারদার ছবি সমেত কাঠের কাঠামো মাথায় দাঁড়িয়ে ‘বহুরূপী’ গোপাল মণ্ডল। লেখা ‘ধর্ম হোক যাঁর যাঁর বড়মা সবার’। রোজ দুপুর দু’টো থেকে বইমেলা শেষ হওয়া ইস্তক মেলার বাইরে বহুরূপী সেজে দাঁড়িয়ে থাকছেন তিনি। শনিবার কপাল ভালো, ১ নম্বর গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকতে পেরেছেন। কথা শুরু হতেই বহুরূপী মোড থেকে খেটে খাওয়া মানুষ মোডে নিমেষে পাল্টে ফেললেন নিজেকে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার রাজারামপুর নিবাস। নিজের ঠিকুজি কোষ্ঠী বললেন বিনা আড়ষ্টতায়। তাঁর হাফডজন ছবিও পাঠালেন হোয়াটসঅ্যাপে। বলছিলেন, ‘১৭ বছর ধরে বহুরূপী সেজেই বড় ছেলে রথীন আর ছোট ছেলে রনিকে মানুষ করেছি!’মিষ্টি কথার খই ফুটছে বইমেলায়। এতদিন দক্ষিণ ভারতীয়রা আলাপ মাত্র ‘স্যর’, ‘ম্যাডাম’ এর বন্যা বইয়ে দিতেন। গড়পড়তা রক্ষণশীল বাঙালি যে এই দুই উপমায় আপ্লুত হন, বুঝে ফেলেছেন ছোটো-মাঝারি-বড়ো ব্যবসায়ীরা। যাঁরা যে কাজে আছেন, তা সে বই বেচা হোক বা ফুচকা, হ্যান্ডমেড জুয়েলারি হোক বা কেক—মুখে মিষ্টি হাসি মানেই সে দোকানে ভিড়। কুইজ প্রতিযোগিতা প্রতিবারই মেলার হট ফেভারিট অংশ। ৫ নম্বর প্যাভিলিয়নের সামনে বিভিন্ন বয়সের জনস্রোত। তার এক পশলা বৃত্ত করে ফেলেছে এক স্মার্ট বছর তিরিশের যুবককে ঘিরে। যুবকটি ব্যক্তিত্বপূর্ণ গলায় মিষ্টি কথায় নির্দেশ দিচ্ছিলেন আর কলের পুতুলের মতো সেসব নিয়মকানুন মানছিল জনতা। বোঝা গেল, ‘মোদিজি’ এবং ‘দিদিমণি’র মতো কোটি কোটি মানুষকে আকর্ষণ করবার বিরল ক্যারিশমা না থাকলেও চলবে। এর ছিটেফোঁটা জনসংযোগেই কাত করা যায় হাজারো মানুষকে!শুধু ‘হ্যাঁ’ বা ‘ইয়েস স্যার’ ‘ইয়েস ম্যাডামই’ নয়, মন রেখে ‘না’ কী করে বলতে হয়, তাও শেখবার আছে এই স্মার্ট মেলার স্মার্ট যুবক-যুবতীদের কাছ থেকে। মেলার গিল্ড অফিসের একতলায় প্রতিবার পাবলিক অ্যানাউন্সমেন্ট করার জায়গা থেকে নিরুদ্দেশ সম্পর্কিত ঘোষণা বা জরুরি বার্তা দেওয়া হয়। গতবছরের মতো এবারও সেখানকার দায়িত্বে অল্পবয়সি এক যুবক। এবার মেলায় কতজন সাময়িক নিখোঁজ হলেন, কতজনকে ফেরানো হল, প্রশ্ন করতে না করতেই যুবকের উত্তর, ‘স্যর, একটা কথা বলব, মনে করবেন না প্লিজ। আমার বসের অনুমতি নিয়ে এলে সবটা বলতে পারব। না হলে পারব না।’ মেলার আশপাশ সম্পর্কে (বাস কোথা থেকে, অটো স্ট্যান্ড কতদূরে, গাড়ি পার্ক কোথায় হবে) হাজার প্রশ্নের উত্তর দিয়েই যাচ্ছেন কয়েকজন কমবয়সি পুলিসকর্মী ও আধিকারিক। ছিঁটেফোটা বিরক্তি নেই তাঁদের আচরণে। দেখে মনে হল, যে জনসংযোগের কোর্স লক্ষাধিক টাকার, রীতিমতো পরিস্থিতিতে পড়ে হাতেকলমে তা তাঁরা রপ্ত করেছেন সুচারু দক্ষতায়।‘আমার নাম বেশি লিখবেন না যেন’—জাগো বাংলার স্টলে দেখা হওয়া লিলি ভৌমিক যেন সাক্ষাৎ জনসংযোগ! মৃদু ভর্ৎসনা সত্ত্বেও ঝরে পড়ল গুরুজনসুলভ স্নেহ। আর ‘ভালো থেকো ভাইটি’র ম঩ধ্যে পেশাদারিত্বের থেকে অনেক দূরে থাকা আন্তরিকতা। এটা তো জনসংযোগই। বইমেলা এরকমই মিষ্টি কথা বিতরণ করে চলেছে অবিরাম। এ মিষ্টিতে সুগার নাই। তাই নির্দ্বিধায় রাশিরাশি মিষ্টি কথা গিলে সবারই মুখ হাসিহাসি।
  • Link to this news (বর্তমান)