• সিক্সেই বিয়ে, পাচার... লড়ে আবার স্কুলে ফিরল ফাইটার
    এই সময় | ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • নির্মল বসু ■ বসিরহাট

    মনে করা যাক, মেয়েটির নাম অচিরা। আসল নাম সামনে আনা ঠিক নয়। অতএব অচিরাই থাক। উত্তর ২৪ পরগনার এক সীমান্ত গ্রাম থেকে তার লড়াই শুরু। কিন্তু হতদরিদ্র পরিবারের মেয়ের পড়াশোনা করে, নাচ–গান–কবিতা শিখে ও ছবি আঁকাকে ভালোবেসে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর লড়াইটা একরকম শেষ হয়েই যাচ্ছিল। একবার নয়, পর পর দু'বার। কিন্তু পরিস্থিতিকে মুখ বুজে মেনে নেয়নি সে।

    বিপদকে নিজের ভবিতব্য বলে মনে করে দমে গিয়ে হাল ছাড়েনি অচিরা। মাকড়সার জালে তাকে আটকানোর চেষ্টা হলেও সেই জাল সে ছিঁড়ে বেরিয়ে এসেছে। সাঁতারের চ্যাম্পিয়ন কোনির তা–ও ক্ষিদ্দার মতো একজন গাইড ছিলেন। যিনি শিষ্যাকে বলতেন, 'ফাইট কোনি, ফাইট।'

    অচিরা কিন্তু তেমন কাউকে পায়নি। উপন্যাসের চরিত্র নয়, বরং অচিরার সঙ্গে মিল বোধহয় অর্ধ শতকেরও বেশি আগে টেবল টেনিসের জাতীয় চ্যাম্পিয়ন, বাংলার রূপা মুখোপাধ্যায়ের (বন্দ্যোপাধ্যায়)। যিনি পিছিয়ে গেলে খেলায় ফিরে আসার জন্য নিজেই নিজেকে উৎসাহ দিতে বলতেন, 'ফাইট রূপা, ফাইট।'

    'ফাইট' করে ম্যাচে ফিরল অচিরাও। বছর তেরোর মেয়েটা স্বপ্ন দেখত, নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে সে পরিবারের হাল ফেরাবে। বাবা তার মারা গিয়েছেন আগেই। নিত্য নিজেকে সংসারের জাঁতাকলে পিষে চলেছেন মা। বিবাহিত দাদা দিনমজুরি করে সংসার টানলেও এ দিক টানতে গিয়ে ও দিকে কুলোয় না।

    এই অবস্থায় মেয়ে স্কুলে পড়বে! চাপ থাকলেও জেদ করেই স্কুল ছাড়েনি অচিরা। কিন্তু হঠাৎই একদিন সকালে মায়ের মুখে সে শুনল যে, দাদা তার জন্য ছেলে দেখেছে। মাথায় যেন আকাশ ভাঙে অচিরার। একবার ভেবেছিল, ছুটে গিয়ে স্কুলের দিদিমণিদের সবটা জানাবে। কিন্তু সেই সুযোগ টুকু তার মেলেনি। কারণ, বিয়ের দিন সকালে সে জেনেছিল, সে দিনই তার বিয়ে। সন্ধেয় বিয়ে হয়ে গেল ক্লাস সিক্সে পড়া অচিরার। ‍বসিরহাটের গ্রাম থেকে তার ঠাঁই হলো স্বরূপনগরে শ্বশুরবাড়িতে।

    তার পরে লড়াই শুরু। শাশুড়ির কাছে অচিরা তার স্কুলে পড়ার ইচ্ছের কথা জানিয়েছিল। কিন্তু শাশুড়ির কাছে বৌমার সেলাইয়ের কাজের কদর থাকলেও তার পড়াশোনার ইচ্ছেকে স্রেফ পা দিয়ে মাড়িয়ে দেওয়া হলো। স্বামীকে নিজের ইচ্ছের কথা বলতে গিয়ে জুটল বেধড়ক মার। বয়সে প্রায় ১৪ বছরের বড়, মদ্যপ স্বামীর কাছে মার খাওয়াটা কালেদিনে রোজকার রুটিন হয়ে দাঁড়াল অচিরার। অত্যাচার শুরু করলেন শাশুড়িও। কয়েক মাসেই অতিষ্ঠ হয়ে উঠল একরত্তি মেয়েটার জীবন। অচিরার কথায়, 'এক সময়ে নিজেকে শেষ করে ফেলার কথাও ভেবেছিলাম। শেষে আর না–পেরে বিয়ের এক বছরের মাথায় এক ভোরবেলায় শ্বশুরবাড়ি থেকে কাউকে না–জানিয়ে বেরিয়ে পড়ি। কোথায় যাব, কী করব সে সব চিন্তা ‍না–করেই উঠে পড়েছিলাম বাসে।'

    কলকাতার শ্যামবাজারে বাস গিয়ে থামলে নেমে পড়ে অচিরা। সেখানে কিছুক্ষণের মধ্যে তার সামনে এসে দাঁড়ান মাঝবয়সি এক মহিলা। অচিরার বৃত্তান্ত শোনার পরে তাকে ওই মহিলা কাছেই নিজের ঘরে নিয়ে যান। খালপাড়ের একটা ঝুপড়ি। অচিরা বলছে, 'দু'–চার দিন সেখানে থাকার পরে ওই মহিলা আমাকে মোটা মাইনের কাজ পাইয়ে দেবেন বলে এক বিকেলে সোনারপুরে নিয়ে যান। তার পরে সেখানে একটা ঝুপড়ির সামনে আমাকে দাঁড়াতে বলে সেখান থেকে সরে যান।'

    অচিরার কথায়, 'বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পরেও মহিলা না–ফেরায় আমার ভয় করতে লাগল। হঠাৎ চোখে পড়ল, কয়েকটা ছেলে আমার দিকে কেমন করে তাকিয়ে রয়েছে। ওদের চাউনিটা ভালো ঠেকল না। সন্ধে হয়ে এসেছে। সেই সময়ে ফুটপাথে আনাজপাতি নিয়ে বসা এক মহিলা এসে আমাকে নিচু গলায় বললেন, 'তুমি পাচারকারীদের খপ্পরে পড়েছ। ওই মহিলা, ওই ছেলেগুলো সকলে এর মধ্যে আছে। তাড়াতাড়ি এখান থেকে পালাও।'

    উত্তর ২৪ পরগনার স্বরূপনগর থানা চত্বরে বসে অচিরার কথা শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল, এ যেন রুদ্ধশ্বাস ছবি বা ওয়েব সিরিজ়ের কাহিনি। অচিরার কথায়, 'সোনারপুরের ওই জায়গা থেকে দৌড়ে পালালাম। কিন্তু ছেলেগুলোও পিছু নিল। একটা সময় পরে পিছনে তাকিয়ে ওদের আর দেখতে পেলাম না। তবে আমি দৌড়তে দৌড়তে ক্লান্ত হয়ে রেল লাইনের সামনে গিয়ে পড়ে গেলাম। চোখ অন্ধকার হয়ে গেল।' ওই কিশোরীকে উদ্ধার করে পুলিশ তাকে পৌঁছে দেয় তার মায়ের কাছে। সবটা জানাজানি হওয়ার পরে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সদস্য এক মহিলা অচিরার বাড়িতে আসেন, অচিরার পড়াশোনা শেখা যে জরুরি, সে কথা বুঝিয়ে বলেন তার মা–কে। ওই সংগঠনের সহযোগিতায় অচিরা ফের স্কুলে ভর্তি হয়েছে, এখন সে ক্লাস সেভেনে। তবে পড়াশোনার পাশাপাশি সে মায়ের সঙ্গে কাপড়ে নকশা তোলার কাজও করছে। তাতে জোগাড় হচ্ছে সংসার চালানো ও পড়াশোনার খরচের টাকা!

    ওই স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সম্পাদিকা বলেন, 'অচিরা যথেষ্ট সাহসী এবং লড়াকু। যে ভাবে প্রথমে নাবালিকা অবস্থায় বিয়ে হয়ে গিয়ে ও তার পরে পাচারকারীদের খপ্পরে পড়েও ইচ্ছাশক্তির জোরে সে ফিরে আসতে পেরেছে, সেটা খুব কম মেয়েই পারে।' অচিরা বলছে, 'আমি পড়াশোনা করে বড় হতে চাই।' ওই সংগঠনের 'দিদি'দের সঙ্গে গ্রামে গ্রামে ঘুরে নাবালিকা অবস্থায় বিয়ে আর নারী পাচারের বিরুদ্ধে মেয়েদের সচেতন করার কাজেও নেমেছে সে। আবার নিজের পড়াশোনার ফাঁকে গ্রামের ছোট ছোট মেয়েদের সে পড়াচ্ছেও। পড়াশোনার মধ্যে দিয়েই অচিরা তাদের মধ্যে​ জাগিয়ে তুলতে চায় নিজের অধিকার সর্ম্পকে সচেতনতা।

    অচিরার লড়াই তাই অবিরাম। শেষ নয়, চলা তো সবে শুরু অচিরার। হেরে যেতে যেতেও একটা গেম সে জিতেছে। ম্যাচ এখনও বাকি।

  • Link to this news (এই সময়)