প্রায় এক দশক হতে চলল মূল বাজেটে মিশে গিয়েছে রেল বাজেট। তবুও প্রতিবারই মূল বাজেটের মধ্যে আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে রেলই। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। তাঁদের মন্ত্রক কী পেতে চলেছে, তা নিয়ে রেলকর্তারা মুখে কুলুপ আঁটলেও, সূত্রের মতে, রেলের মূলত তিনটি বিষয়ে এবার জোর দিতে পারেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন। যাত্রী স্বাচ্ছন্দ্য, নিরাপত্তা ও দেশীয় উৎপাদন। পাশাপাশি, নজরে থাকবে ভোটমুখী পশ্চিমবঙ্গের জন্য বিভিন্ন রেলপ্রকল্পে।
গত কয়েক বছরে রেলের যাবতীয় আগ্রহের কেন্দ্রে ছিল বন্দে ভারত ট্রেন। পরবর্তী ধাপে বন্দে ভারত স্লিপার ট্রেন আরও বেশি করে চালানোর উপরে জোর দিতে চাইছে রেল। ইতিমধ্যেই কলকাতা ও কামাখ্যার মধ্যে বন্দে ভারত স্লিপার ট্রেনের যাত্রা শুরু হয়েছে। আগামী দিনে আরও বেশি শহরের মধ্যে ২৪ কামরার বন্দে ভারত স্লিপার ট্রেন চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে নরেন্দ্র মোদী সরকারের। লক্ষ্য, দূরপাল্লার বর্তমান ট্রেনগুলিকে ধীরে ধীরে তুলে দিয়ে সব রুটেই বন্দে ভারত স্লিপার ট্রেন চালানো। বিষয়টি যদিও সময়সাপেক্ষ। সূত্রের মতে, আসন্ন বাজেটে কয়েক ডজন বন্দে ভারত স্লিপার ট্রেনের জন্য অর্থ বরাদ্দ করতে চলেছেন নির্মলা। যাদের মধ্যে বেশ কিছু ছুঁয়ে যেতে পারে ভোটমুখী পশ্চিমবঙ্গকে। স্লিপার ছাড়াও অসংরক্ষিত প্যাসেঞ্জার ট্রেনের বিকল্প হিসেবে অন্তত গোটা পঞ্চাশেক অমৃত ভারত ট্রেন চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। মূলত পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলি, যেমন পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড থেকে পরিযায়ী শ্রমিকেরা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কাজের খোঁজে যান, তাঁদের যাত্রা সুগম করতেই ওই ট্রেন চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। রেল সূত্রের মতে, আগামী দিনে শতাব্দী ট্রেনের পরিবর্তে নমো ভারত ট্রেন চালানোর পরিকল্পনা নিয়েছে কেন্দ্র। সেই খাতেও এবার বাড়তি অর্থ দেওয়া হতে পারে।
যাত্রী নিরাপত্তা রেলের বরাবরই দুশ্চিন্তার কারণ। দু’টি ট্রেনের মুখোমখি সংঘর্ষ ঠেকাতে কয়েক বছর ধরেই কবচ (অ্যান্টি কলিশন বা দুর্ঘটনা প্রতিরোধী) ব্যবস্থা লাগানো শুরু করেছে রেল। রেল সূত্রের মতে, প্রাথমিক ভাবে রেলের যে অতি ঘনত্বযুক্ত (হাই ডেনসিটি) নেটওয়ার্ক রয়েছে, সেই ১৮ হাজার কিলোমিটারে কবচ ব্যবস্থা বসানোর লক্ষ্য নিয়েছে রেল। রেল জানিয়েছে, গত আর্থিক বছরের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত প্রায় ৬৫৪ কিলোমিটার রেল লাইন, ১৫৫টি রেলওয়ে স্টেশন ও ২,৮৯২টি ট্রেনকে ওই ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। সূত্রের মতে, এবার অন্তত আরও চারশো থেকে পাঁচশো কিলোমিটারের লাইনকে ওই ব্যবস্থায় আনার কথা ভাবা হচ্ছে। সব মিলিয়ে নিরাপত্তা খাতে ১ থেকে ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকার বরাদ্দ হতে পারে। যা গতবারের সুরক্ষা খাতে বৃদ্ধির চেয়ে প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি। যে টাকা কবচ ছাড়াও সিগন্যাল ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, লাইন মেরামতি, সেতুর রক্ষণাবেক্ষণে খরচ করা হবে।
বর্তমানে বন্দে ভারত ট্রেন থেকে কবচ ব্যবস্থা— সবই তৈরি হচ্ছে দেশীয় ভাবে। পাশাপাশি, বিশ্বের প্রায় কুড়িটি দেশে রেল কোচ সরবরাহ করে থাকে ভারত। ফলে চাহিদা বিপুল। যন্ত্রাংশ ও কোচের উৎপাদন বৃদ্ধির বিষয়টি মাথায় রেখে বাজেটে একাধিক নতুন রেল কারখানা বা বর্তমান কারখানাগুলির ক্ষমতা বাড়ানোর কথা ঘোষণা হতে পারে। সূত্রের মতে, এর মধ্যে উত্তরবঙ্গে একটি কারখানার ঘোষণা হতে পারে।
এ বছর ভোট পশ্চিমবঙ্গে। গত বাজেটের সময় বিহারে ভোট থাকায় একাধিক রেল প্রকল্প ঘোষণা করা হয়েছিল নীতীশ কুমারের রাজ্যের জন্য। রেল সূত্রের মতে, বাজেটে এ বছর রেলের খাতে পশ্চিমবঙ্গের জন্য প্রায় পনেরো হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ হতে পারে। যে টাকার একটি বড় অংশ খরচ হবে রাজ্যের একশোটি অমৃত ভারত স্টেশনের পরিকাঠামো উন্নয়নে। এ ছাড়া, অর্থ বরাদ্দ থাকছে লালগোলা-জিয়াগঞ্জ, কৃষ্ণনগর-বেথুয়াডহরি লাইনের জন্য। ডাবলিং খাতে বরাদ্দ বাড়ছে নিউ কোচবিহার-শামুকতলা রোড, ফালাকাটা-নিউ ময়নাগুড়ি প্রকল্পে। এ ছাড়া, মতুয়া ভোটের কথা মাথায় রেখে এবং সীমান্তে পরিকাঠামো বৃদ্ধির লক্ষ্যে উত্তর চব্বিশ পরগনা ও নদিয়াতে চারটি রেল প্রকল্পের আওতায় (বনগাঁ-পোড়ামহেশতলা, বনগাঁ-চাঁদবাজার, চাঁদবাজার-বাগদা, রানাঘাট-দত্তফুলিয়া) ৫৩ কিলোমিটার রেললাইন পাতার বরাদ্দ বাজেটে থাকতে পারে। বরাদ্দ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে মেট্রো খাতে। সূত্রের মতে, পশ্চিমবঙ্গের রেল প্রকল্পে রাজ্য প্রয়োজনীয় সাহায্য করছে না— এমন কথারও উল্লেখ থাকতে পারে বাজেট নথিতে।
এছাডা়, প্রবীণদের টিকিটে ছাড় ফিরিয়ে আনার দাবি দীর্ঘ দিনের। রেলের এতে আপত্তি থাকলেও, বিজেপি নেতৃত্ব ভাল করেই জানেন, ওই একটি সিদ্ধান্তে দেশের বড় সংখ্যক মানুষের মন জিতে নেওয়া সম্ভব। তাই পাঁচ রাজ্যের ভোটের কথা মাথায় রেখে জনমোহিনী সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত নির্মলা নেন কি না, সেটাই এখন দেখার।