রাজ্যগুলির দাবি মানল না কেন্দ্র, করের ভাগ সেই ৪১ শতাংশই
বর্তমান | ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
নিজস্ব প্রতিনিধি,নয়াদিল্লি: রাজ্যগুলির আর্থিক সঙ্কট বিপুল বাড়তে চলেছে। ষোড়শ অর্থ কমিশনের রিপোর্টে রাজ্যের জন্য একের পর এক দুঃসংবাদ দেওয়া হয়েছে সুপারিশের মাধ্যমে। যদি প্রতিটি সুপারিশ কেন্দ্র কার্যকর করতে চায় এবং রাজ্যকেও চাপ দেয়, তাহলে রাজ্যগুলির রাজকোষে বিপুল টান পড়বে। তার ফলশ্রুতি হল, রাজ্যগুলিকে আরও বেশি করে কেন্দ্রীয় সরকারের উপর নির্ভরশীল হতে হবে। বস্তুত যে বিষয়গুলির উপর এতদিন ধরে লক্ষ্য করা হয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার জোর দিচ্ছে, অর্থ কমিশনের অবিকল সেই সুপারিশ কেন্দ্রীয় সরকার গ্রহণ করেছে। রবিবার বাজেট পেশ করার শুরুতেই অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন জানিয়ে দেন যে, অর্থ কমিশনের সুপারিশ কেন্দ্র গ্রহণ করেছে। অর্থাৎ ওই সুপারিশ কার্যকর করতে কেন্দ্রীয় সরকারের আপত্তি নেই। রাজ্যগুলির জন্য সবথেকে বড় ধাক্কা হল, দেশজুড়ে মোট আদায়ীকৃত ট্যাক্সের যে ভাগ রাজ্যগুলিকে দেওয়া হয়, সেই অনুপাত অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। যা ৪১ শতাংশ। অর্থাৎ দেশ থেকে মোট যত কেন্দ্র-রাজ্য বিভাজনযোগ্য ট্যাক্স কেন্দ্রের কাছে জমা হয়, তার ৪১ শতাংশ পায় রাজ্যগুলি। এই একই হার আগামী ৫ বছরও বজায় থাকবে। অর্থাৎ যা অনুপাত ছিল এতদিন ধরে, সেটাই থাকবে আরও ৫ বছর। অথচ তাবৎ রাজ্য বারংবার চেয়েছে, যাতে রাজ্যের প্রাপ্য হার বাড়ানো হয়। একঝাঁক রাজ্য দাবি করেছে ৫০ শতাংশ করা হোক রাজ্যের প্রাপ্যহার। রাজ্যগুলির যুক্তি, রাজ্য থেকে ট্যাক্স আদায় করে কেন্দ্র নিয়ে যাবে, অথচ রাজ্যের ভাগ বাড়ানো হবে না, এটা যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় চলতে পারে না। সবথেকে উল্লেখযোগ্য বঞ্চনা হল, চতুদর্শ অর্থ কমিশন কেন্দ্র থেকে রাজ্যের প্রাপ্য ৩২ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি করে ৪২ শতাংশ করেছিল। কিন্তু পঞ্চদশ অর্থ কমিশন ২০১৯ সালে সেই ৪২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ নতুন দুই কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল জম্মুকাশ্মীর ও লাদাখের জদন্য বরাদ্দ করে। প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, পরবর্তীকালে এই ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে এবং আবার যথাযথ ভাগ পাবে রাজ্যগুলি। সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা হয়েছে। উলটে ষোড়শ অর্থ কমিশনের কাছে রাজ্যগুলি বহু আশা করেছিল যে, এবার সম্ভবত এই রাজ্যের ভাগের ট্যাক্স বাড়বে। সেটা হল না।রাজ্যের সম্ভাব্য দুর্গতি আশঙ্কার এখানেই শেষ নয়। ষোড়শ অর্থ কমিশনের রিপোর্ট পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে, কঠোর সংস্কারমুখী সুপারিশ করেছে প্রাক্তন নীতি আয়োগ কর্তা অরবিন্দ পানাগোড়িয়ার নেতৃত্বাধীন অর্থ কমিশন। রিপোর্টে বলা হয়েছে, দেশজুড়ে যে ভরতুকি এবং জনতাকে শর্তহীন টাকা ট্রান্সফার চলছে, সেসব বন্ধ করা দরকার। কেন্দ্র ও রাজ্য উভয়পক্ষের রাজকোষে প্রবল চাপ পড়ছে। অর্থ কমিশন বলেছে, ক্যাশ ট্রান্সফারের এই কর্মসূচি অবিলম্বে হয় বন্ধ করা হোক কিংবা রিভিউ করা হোক যে কাদের দেওয়া উচিত, আর কাদের নাম বাদ যাওয়া দরকার। একইভাবে সরকারি ভরতুকি প্রথার বিরুদ্ধাচারণ করেছে অর্থ কমিশন। প্রসঙ্গত কেন্দ্রীয় সরকার তিনটি সেক্টরে সবথেকে বেশি ভরতুকি দেয়। ১) পেট্রপণ্য ২) গণবন্টন ৩) সার। এই ভরতুকিও কতদিন চলবে সেকথা ভেবে দেখতে বলেছে অর্থ কমিশন। বলা হয়েছে প্রতিটি ভরতুকি প্রকল্পের একটি করে সানসেট ক্লজ থাকা দরকার। অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময় পর সেই ভরতুকি বন্ধ হবে।অর্থ কমিশন বেসরকারিকরণের জয়গান গেয়েছে। ষোড়শ অর্থ কমিশনের রিপোর্ট বলা হয়েছে, রুগ্ন সরকারি সংস্থা বন্ধ করে দিতে হবে। যে সংস্থা দেশের জিডিপি কিংবা অর্থনীতির অগ্রগতিতে কোনও নিজস্ব যোগদান নেই, তাদের চালু রাখার দরকার কী? অর্থাৎ ষোড়শ অর্থ কমিশন হুবহু মোদি সরকারের মনের মতো কথাই লিখেছে রিপোর্টে। সবকারি সংস্থা, ব্যাঙ্ক অথবা সমবায়ের ভূমিকার সঙ্গে যে নিছক ব্যবসা নয়, সরকারের একটি সামাজিক দায়িত্বও জড়িত থাকে, একথা অর্থ কমিশন মানতে নারাজ। আবার কমিশন তাবৎ বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ সংস্থার বেসরকারিকরণ করার সুপারিশ করেছে। মোদি সরকারের বিদ্যুৎ মন্ত্রক ঠিক এই মর্মেই আইন তৈরি করেছে আগেই। আর সেই কারণেই একদিকে রবিবার কেন্দ্রের তরফে সানন্দে গ্রহণ করা হয়েছে অর্থ কমিশনের রিপোর্ট। আর অন্যদিকে বাজেটে এদিনই বেসরকারিকরণের লক্ষ্যে সরকারি সংস্থা বিক্রি করে ৮০ হাজার কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করেছে মোদি সরকারের অর্থমন্ত্রক। ২০২৫ সালে যে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৪ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রায় তিনগুণ বাড়ানো হয়েছে। সরকারি সংস্থা, ব্যাঙ্ক, সম্পদ বিক্রি হবে এবার অবাধে। এবার সেই নীতি গ্রহণ করা সহজ। কারণ অর্থ কমিশনই তো বলেছে! অতএব সরকারের দায় নেই!