• বাজেট! দিশাহীন, সামাজিক সুরক্ষায় বিপুল ছাঁটাই করে নজর প্রতিরক্ষায়
    বর্তমান | ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • সমৃদ্ধ দত্ত, নয়াদিল্লি: অপ্রাপ্তির বাজেট। জনতার হাতে দিল না কানাকড়িও। গত এক বছরে ২৮ লক্ষ কোটি টাকা ট্যাক্স দিয়েছেন করদাতারা। কিন্তু তাঁদের জন্য একটি শব্দও উচ্চারণ করলেন না অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন। তাঁর বাজেটে নতুন কোনো উপহারই নেই আয়করে। যতটুকু আছে, তা স্বদেশবাসীর জন্য নয়। যা কর-সুরাহা, সবই গেল প্রবাসী ভারতীয় বা এনআরআইদের ঝুলিতে। দেশে-বিদেশে সম্পত্তি থাকলে এবার থেকে তাঁদের কম ট্যাক্স দিতে হবে। স্বদেশি জয়গানের বাজেটে বিদেশি সংস্থা পেল ২০ বছরের ‘জিরো ট্যাক্স’ উপহার। বেকারত্বে জ্বলছে যুবসমাজ। অথচ সেই দিশায় কোনো নির্দিষ্ট ঘোষণাই নেই বাজেটে! উলটে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রকের বাজেট বরাদ্দ গত বাজেটের তুলনায় বাড়ানো হল মাত্র ২০ কোটি টাকা!বিফল প্রতিশ্রুতির বাজেট। কারণ, মোদি সরকারের উচ্চকিত ঘোষণা কী ছিল? বাজেট হবে সংস্কারমুখী। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর সরকারের নাম দিয়েছেন—রিফর্ম এক্সপ্রেস। দেখা গেল, সেই সংস্কারের অর্থ আসলে সরকারি সংস্থা বিক্রি। ২০২৫ সালের তুলনায় নয়া বাজেটে বেসরকারিকরণের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় তিনগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। গত বছর সরকারি সংস্থা বিক্রি করে ৩৪ হাজার কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছিল। এবার সেই টার্গেট ৮০ হাজার কোটি। অতএব অবাধ বেসরকারিকরণের দরজা খুলছে।বঞ্চনার বাজেট। বাংলার জন্য তো বটেই। ১৫ বছর ধরেই অপ্রাপ্তি। এবার বাংলা প্রত্যাশা করেছিল, ভোটের মুখে মোদির অর্থমন্ত্রী হয়তো কোনো প্যাকেজ দেবেন বাংলাকে। পাওয়া গেল তিনটি পরিকাঠামো উন্নয়নমুখী উপহার। ডানকুনি থেকে সুরাত ডেডিকেটেড ফ্রেট করিডর। দুর্গাপুরে ইন্ডাস্ট্রিয়াল করিডর। বারাণসী থেকে শিলিগুড়ি হাই স্পিড ট্রেন। পূর্ব ভারতের জন্য একটি কেন্দ্রীয় ফ্যাশন ইনস্টিটিউট নির্মাণ হবে।প্রতিরক্ষার বাজেট। প্রত্যাশা মতোই। এবার ১ লক্ষ কোটি টাকার বেশি বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে প্রতিরক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ। বিগত বাজেটে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক পেয়েছিল ৬ লক্ষ ৮১ হাজার কোটি টাকা। এবার পাচ্ছে ৭ লক্ষ ৮৬ হাজার কোটি। সেটাও সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ বিপুল হারে ছেঁটে। প্রধানমন্ত্রী গরিব কল্যাণ, জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা, প্রধানমন্ত্রী স্বাস্থ্য সুরক্ষা যোজনা, জল জীবন মিশন এবং আরও অনেক। পরিকাঠামো উন্নয়নের বরাদ্দ বৃদ্ধি হয়েছে ঠিকই। কিন্তু ১১ লক্ষ কোটি থেকে বেড়ে সাড়ে ১২ লক্ষ কোটি টাকা। সেতু, রাস্তা, বন্দর, রেল, এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ বাড়লে কর্মসংস্থান বাড়বে। এই হল ফরমুলা। তাও যদি বরাদ্দ অর্থ সঠিকভাবে খরচ হয়। তবে এর মধ্যেও গ্রামীণ অর্থনীতির কথা ভুলতে পারেননি নির্মলা। মনমোহন সিং জমানার ১০০ দিনের কাজের গ্যারান্টি প্রকল্পের নাম বদলালেও সেটাই যে গ্রামীণ অর্থনীতির মেরুদণ্ড, সে কথা অর্থমন্ত্রী জানেন। তাই এই প্রকল্পে বরাদ্দ হয়েছে ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এখনও পর্যন্ত রেকর্ড!অর্থনীতি উজ্জ্বল হচ্ছে। বিশ্বের মন্দার মধ্যে ভারতই একমাত্র উন্নয়নের বাতিস্তম্ভ। ভারত চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি হয়েছে ইত্যাদি গালভরা দাবি করা হলেও রবিবার বাজেট থেকে স্পষ্ট—মোদি সরকার আয়ের সংস্থান সম্পর্কে দিশাহীন এবং রাজকোষের স্বাস্থ্য নিয়ে এতটুকু আত্মবিশ্বাসী নয়। তার প্রতিফলন হল, একঝাঁক নতুন প্রকল্প ঘোষণা করা হয়েছে বটে, কিন্তু বরাদ্দ নগণ্য। বায়ো ফার্মা প্রকল্প দেশজুড়ে চালু হবে। অথচ ৫ বছরের জন্য বরাদ্দ ১০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ বছরে ২ হাজার কোটি। কন্টেনার ম্যানুফাকচ্যারিং স্কিমের জন্য বরাদ্দ একই। টেক্সটাইল সেক্টরে একঝাঁক বৈপ্লবিক ঘোষণা হয়েছে। অথচ বরাদ্দ বৃদ্ধি কত? ৭ কোটি! আবাসন ও নগরোন্নয়ন, এই দুই সেক্টর দেশের উন্নয়নের চালিকাশক্তি। সেই মন্ত্রকের বরাদ্দ ৯৬ হাজার কোটি থেকে কমে হয়েছে ৮৫ হাজার কোটি টাকা।এদিন মাত্র দেড় ঘণ্টার বাজেট বক্তৃতায় অদৃশ্যভাবে উপস্থিত ছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। কারণ বাজেটজুড়ে ছিল শুল্কবৃদ্ধির ছায়া। রপ্তানি কমানো এবং স্বদেশি উৎপাদন বৃদ্ধির তাড়না। সেই লক্ষ্যেই একঝাঁক পণ্যের আমদানিতে শুল্ক কমেছে। তবে কোন শর্তে? সেই পণ্য, উপকরণ, কাঁচামাল, যন্ত্রাংশ নিয়ে ভারতে পণ্য তৈরি করতে হবে। বিদেশি সংস্থা যদি ভারতে ডেটা সেন্টার করতে চায়, তাহলে তাদের ২০ বছরের জন্য ট্যাক্স ফ্রি। হ্যান্ডলুম থেকে খাদি। ক্ষুদ্র শিল্প কিংবা ক্রীড়া-উপকরণ। দেশে উৎপাদন করলেই করছাড়। উদার আহ্বান নির্মলার। কারণ এক—আমেরিকার শুল্কবৃদ্ধি থেকে রক্ষা পাওয়ার মরিয়া চেষ্টা। কিন্তু দিনের শেষে আম জনতা কী পেল? খাদ্য মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, হাতে নগদ টাকার অভাব, ব্যাংকে সঞ্চয় হ্রাস, ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া। উদ্বেগ বৃদ্ধির বাজেট। সমাধানের নয়।
  • Link to this news (বর্তমান)