• ব্রাত্য দার্জিলিং টি, উত্তরবঙ্গের চায়ের ভাঁড়ারে প্রাপ্তি শূন্য! বাজেটে হতাশা
    এই সময় | ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • অনিমেষ দত্ত ও পিনাকী চক্রবর্তী

    বাজেটে উত্তরবঙ্গের অর্থনীতির মেরুদন্ড চা শিল্পের জন্য একটিও শব্দ খরচ করেননি কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন। আর এতেই হতাশ চা শিল্প মহল। রবিবার টানা নবম বারের জন্য বাজেট পেশ করেছেন অর্থমন্ত্রী। অন্য শিল্পের পাশাপাশি রাজ্যের চা বলয়ও এ দিনের বাজেটের দিকে তাকিয়েছিল। আশা ছিল, ধুঁকতে থাকা চা শিল্পের জন্য কোনও বিশেষ প্যাকেজ, ভর্তুকি, কর ছাড়ের ঘোষণা আসবে। কিন্তু সব আশায় জল ঢেলে চায়ের ভাঁড়ারে প্রাপ্তি শূন্যই।

    উত্তরবঙ্গে বর্তমানে ৩৩৪টি চালু চা বাগান রয়েছে, যেখানে প্রায় সাড়ে চার লক্ষ শ্রমিক কর্মরত। বছরে প্রায় ৩০ কোটি কিলো চা উৎপাদিত হয়। চা শিল্পপতিরা আশা করেছিলেন, চায়ের ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণ, কর মকুব, রপ্তানিতে ভর্তুকি ও নেপাল থেকে অবৈধ ভাবে আমদানিকৃত চায়ের উপরে কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে। কিন্তু বাজেটে সে সবের কোনও উল্লেখই না-থাকায় আশাহত চা শিল্পপতিরা। ক্ষুদ্র চা চাষিদের সর্বভারতীয় সংগঠন 'সিস্টা'-র সভাপতি বিজয়গোপাল চক্রবর্তী বলেন, 'উত্তরবঙ্গের প্রায় ৫০,০০০ ক্ষুদ্র চাষিকে উপেক্ষা করা হয়েছে। গত দু'বছর ধরে চা শিল্প ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন। সরকারি হস্তক্ষেপ ছাড়া এই সঙ্কট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়। বাজেটে ক্ষুদ্র চা চাষিদের জন্য কোনও সহায়তা দেওয়া হয়নি।'

    বাজেটের আগে সিস্টা-র তরফে কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রকে 'মেমোরান্ডাম' দিয়ে গুচ্ছ প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। তার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব ছিল ক্ষুদ্র চা চাষিদের 'কৃষক' হিসেবে মর্যাদা দেওয়া। বর্তমানে গোটা দেশে মোট যত পরিমাণ চা উৎপাদিত হয়, তার মধ্যে ৫০-৫৫ শতাংশই আসে ক্ষুদ্র চা বাগান থেকে। বিজয়গোপালের মতে, ক্ষুদ্র চা চাষিদের 'কৃষক' হিসেবে মর্যাদা দেওয়া হলে ক্ষুদ্র চা চাষিরা কৃষিজীবীদের জন্য কেন্দ্রের যে ১৮টি প্রকল্প রয়েছে, তার সুযোগ-সুবিধা পেতেন। এ ছাড়াও জগদ্বিখ্যাত দার্জিলিং চায়ের জন্য বিশেষ কোনও প্যাকেজের ব্যবস্থা করা যায় কি না, সেই প্রস্তাবও পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু বাজেটে সে সবের কোনও উল্লেখ না-থাকায় হতাশা সর্বত্র।

    বিষয়টিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে চা শ্রমিক সংগঠনগুলিও। তৃণমূল চা বাগান শ্রমিক ইউনিয়নের (টিসিবিএসইউ) চেয়ারম্যান নকুল সোনার বলেন, 'পূর্বের বেশ কয়েকটি প্রতিশ্রুতি অপূর্ণ রয়ে গিয়েছে। ছাত্রছাত্রীদের স্টাইপেন্ড বন্ধ হয়ে গিয়েছে। জলপাইগুড়িতে কেন্দ্রীয় ভাবে অধিগ্রহণ করা চারটি চা বাগানের শ্রমিকরা দীর্ঘদিন ধরে মজুরি এবং প্রভিডেন্ট ফান্ডের বকেয়া পাননি।' উত্তরের চা বলয়ের প্রবীণ নেতা জিয়াউল আলম এই বাজেটকে 'বোগাস' বলে মন্তব্য করে বলেন, '২০১৪-তে ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিজেপি সরকার চা শিল্প এবং শ্রমিকদের জন্য কিছুই করেনি। এ বারের বাজেটেও তারই প্রতিফলন পাওয়া গিয়েছে।'

    সম্প্রতি উত্তরবঙ্গের চা শ্রমিকদের এমপ্লয়িজ স্টেট ইনশিওরেন্স কর্পোরেশন (ইএসআইসি)-এর আওতায় আনার ব্যাপারে চিন্তাভাবনা শুরু করেছে রাজ্য সরকার। চা শ্রমিকরা এর আওতায় এলে ইএসআই হাসপাতাল কিংবা রেফারেল নার্সিংহোমগুলি থেকে বিনামূল্যে চিকিৎসা পরিষেবা পাবেন। আজ, সোমবার চা বণিকসভাগুলিকে নিয়ে একটি বৈঠক ডেকেছে রাজ্যের শ্রম দপ্তর। ঠিক তার আগের দিন কেন্দ্রীয় বাজেটে চা শ্রমিকদের কোনও প্রাপ্তি না-হওয়ার বিষয়টি সামনে রেখে বিজেপিকে খোঁচা দিয়েছে তৃণমূল। দলের রাজ্যসভার সাংসদ প্রকাশ চিকবরাইক বলেন, 'চা শ্রমিকরা রাজনৈতিক ভাবে এর জবাব দেবেন। কেন্দ্রীয় সরকার বাংলার চা শিল্পকে ঘোর অনিশ্চয়তার সামনে দাঁড় করিয়েছে।' পাল্টা আলিপুরদুয়ারের বিজেপি সাংসদ মনোজ টিপ্পা বলেন, 'বাজেটে চা শিল্প নিয়ে কোনও কথা না-বলা হলেও, বঞ্চনার অভিযোগ ঠিক নয়। আসলে তৃণমূল মানুষকে বিভ্রান্ত করতে চাইছে।'

  • Link to this news (এই সময়)