ভোগান্তি চলছেই, শুনানিতে ডাক বিশেষ চাহিদাসম্পন্নকেও
আনন্দবাজার | ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
শুনানিতে কখনও ডেকে পাঠানো হচ্ছে শয্যাশায়ী প্রবীণকে। কখনও রাজ্যের বাইরে থাকা রোগাক্রান্ত ব্যক্তিকে এক দিনের মধ্যেইশুনানি কেন্দ্রে হাজির হতে বলা হচ্ছে। কারও ছ’টি সন্তান থাকায় বার বার ডেকে পাঠিয়ে হয়রান করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। কিছু দিন আগে আবার মালদহের হরিশ্চন্দ্রপুরের এক যুবককে বার বার নথি চেয়ে পাঠানো হচ্ছিল, এই অভিযোগেতিনি জমির দলিলের পাশাপাশি দাদুর কবরের মাটি নিয়ে ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) শুনানিতে হাজির হয়েছিলেন। এ বার অভিযোগ উঠল, শুনানিতে ডেকে পাঠানো হয়েছে এক বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন যুবককে। তাঁর পরিবারের দাবি, যুক্তিগ্রাহ্যঅসঙ্গতির (লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি) প্রশ্ন ওঠায় নতুন করে নথি জমা দেওয়ার পরেও তাঁদের শুনানিতে হাজির হতে বলা হয়েছে। তাঁদের অটিস্টিক সন্তানের ‘ডিজ়এবিলিটি সার্টিফিকেট’ জমা দেওয়ার পরেও সুরাহা মেলেনি।
আরাত্রিক দে নামে ২৫ বছরের ওই যুবকের বাড়ি চুঁচুড়াবিধানসভা এলাকায়। তাঁর মা, পেশায় শিক্ষিকা ব্রততী চৌধুরী জানান, ডিসেম্বর মাসের শেষ দিকেএক দিন তাঁদের বাড়িতে গিয়ে বুথ লেভেল অফিসার (বিএলও) জানান, তাঁর সন্তানের ক্ষেত্রে বাবার নাম মিলছে না। ফলে যুক্তিগ্রাহ্যঅসঙ্গতির প্রশ্ন উঠেছে। সমস্যা সমাধানে ব্রততী ছেলের জন্মের শংসাপত্র ও ডিজ়এবিলিটি সার্টিফিকেট জমা দেন। সঙ্গে তাঁর স্বামীর ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় নাম থাকার প্রামাণ্য নথি জমা করেন। এরপরে গত শুক্রবার ফের ব্রততীদের বাড়িতে আসেন বিএলও। তাঁদের জানানো হয়, নথি দিয়েও কাজ হয়নি। ছেলেকে নিয়ে তাঁদের শুনানিতে যেতে হবে। ব্রততী বলেন, ‘‘পুরনো কালেক্টরেটবিল্ডিংয়ে যেতে বলা হয়েছে। আমার ছেলে অটিস্টিক। ও কথা বলে না। এ ভাবে কী করে নিয়ে যেতে বলা হতে পারে? তা ছাড়া, ওই জায়গায় হুইলচেয়ার নিয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিও নেই। যাঁরা হুইলচেয়ার নির্ভর, তাঁরা কী করে যাবেন? প্রবীণ মানুষেরাই বা কী ভাবে ওখানে গিয়ে শুনানিতে অংশগ্রহণ করছেন, ভেবে পাচ্ছি না।’’
২০০১ সালে জন্ম আরাত্রিকের। তাঁর যখন ১৮ বছর বয়স, তখনই সচিত্র ভোটার পরিচয়পত্র তৈরি করায় তাঁর পরিবার। সেই সময়ে বাড়িতে গিয়েই আরাত্রিকের ভোটার কার্ড সংক্রান্ত সমস্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছিল বলে দাবি পরিবারের। জেলা প্রশাসনের তরফেও যথাসম্ভব সাহায্য মিলেছিল। কিন্তু এসআইআর শুনানিতে কী করে ডেকে পাঠানো হল, সেটাই ভেবে পাচ্ছেন না তাঁরা। অনেকেরই প্রশ্ন, নির্বাচন কমিশন অসুস্থ, প্রবীণ এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্নদের বাড়িতে গিয়ে শুনানির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে বলছে বার বার। কোনও ভাবেই এমন কাউকে ডেকে পাঠানো যাবে না বলেও নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে দফায় দফায়। তার পরেও কেন তাঁদের অনেককেই শুনানির জন্য নির্দিষ্ট জায়গায় যেতে বলা হচ্ছে, সেই প্রশ্ন উঠছে। তবে কি কমিশনের নির্দেশ সমস্ত স্তরে পৌঁছচ্ছে না?
নির্বাচন কমিশনের তরফে সরকারি ভাবে কেউ মন্তব্য করতে না চাইলেও কমিশন সূত্রের বক্তব্য, বয়স্ক, অসুস্থ এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্নদের বাড়িতে শুনানি নিয়ে কমিশন একাধিক বার গাইডলাইন দিয়েছে। লিখিত ভাবেও তাঁদের কথা বলা আছে। কিন্তু এর অন্যথা হলে সে ব্যাপারে দায়বদ্ধ জেলা প্রশাসনগুলিই। কারণ, নির্বাচন কমিশন যা যা নির্দেশ দিচ্ছে, তা কার্যকর করার কথা জেলা প্রশাসনের। কিন্তু সব ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসনের সাহায্য মিলছে না বলে অভিযোগ। এর পিছনে রাজনৈতিক কিছু চাপ কাজ করছে বলেও মনে করছে কমিশনের একাংশ। কিন্তু ভুগতে হচ্ছে তো সেই সাধারণ মানুষকেই? এ প্রশ্নের অবশ্য স্পষ্ট উত্তর মিলছে না।