পাচারের পর অন্ধকারে কেটেছে দীর্ঘদিন, পরীক্ষায় বসল খড়গ্রামের পাঁচ কিশোরী
বর্তমান | ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
সংবাদদাতা, কান্দি: মহিলা পাচারের আঁতুড়ঘর মুর্শিদাবাদ থেকে হাতবদল হয়ে অন্ধকার জগতে পৌঁছে গিয়েছিল পাঁচ কিশোরী। ছোট ছোট কুঠুরিতে খদ্দেরদের খুশি করাই ছিল তাদের কাজ। তবে পুলিশ ও প্রশাসনের সহায়তায় তারা শেষ পর্যন্ত সেই অন্ধকার জীবন থেকে মুক্ত হতে পেরেছে। এবছর মাধ্যমিক পরীক্ষা দিতে বসে চোখে জল ওই পাঁচ কিশোরীর। খড়গ্রামের সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত হোমের আবাসিক ওই পাঁচ কিশোরীর মধ্যে চারজন স্থানীয় নগর আজিজা মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে পরীক্ষা দিচ্ছে। তাদের সিট পড়েছে দুর্গাপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে। আর রঘুনাথগঞ্জ বালিকা বিদ্যালয় থেকে এক কিশোরী পরীক্ষা দিচ্ছে খড়িবোনা উচ্চ বিদ্যালয় পরীক্ষা কেন্দ্রে। হোম সূত্রে আরও জানা গিয়েছে, জঙ্গিপুরের এক কিশোরী কয়েকবছর আগে পাচার হয়ে গিয়েছিল। পাচারের পর বারবার হাতবদল হয়েছে সে। অন্ধকার ঘরে খদ্দেরকে খুশিও করতে হয়েছে। পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে খড়গ্রামের হোমে পাঠায়। তবে পড়াশোনার প্রতি তার ছিল ভীষণ আগ্রহ। সেই আগ্রহকে সম্মান করে হোম কর্তৃপক্ষ এবছর মাধ্যমিক দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। ওই ছাত্রী জানিয়েছে, জীবনে বড় একটা ভূল করে ফেলেছিলাম। তবে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি। মাধ্যমিকে ভালো ফল করে দেখাব। জেলার দৌলতাবাদ থানা এলাকার এক কিশোরীও এবছর মাধ্যমিক দিচ্ছে ওই হোম থেকে। নিজের এলাকাতেই শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিল সে। এরপর ২০২৩ সাল থেকে তার ঠাঁই হয়েছে ওই হোমে। সেও এবছর দুর্গাপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিচ্ছে। জেলার কর্ণসুবর্ণ এলাকার এক আদিবাসী কিশোরীও পাচারের পর বারবার হাতবদল হয়েছিল। এরপর পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হোমে পাঠিয়েছিল। এখানে প্রায় ছ’ বছর কেটেছে তার। হোম কর্তৃপক্ষ ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি করে ওই কিশোরীকে। এবার সেও পরীক্ষায় বসেছে। এদিকে হোমের আরও এক কিশোরীর জীবন আরও করুণ। বাবা ও মায়ের সঙ্গে বনিবানা না হওয়ায় বিচ্ছেদ হয়ে যায়। এরপর নিষিদ্ধ পল্লিতে ঠাঁই হয় তার। কয়েকবছর আগে পুলিশ রেড লাইট এলাকা থেকে তাকে উদ্ধার করে হোমে পাঠায়। সেখানে থেকেই মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছে সে। অন্যদিকে জন্মের পরেই রাস্তায় কুড়িয়ে পাওয়া এক কিশোরীও এবছর মাধ্যমিক দিচ্ছে। তার মা মানসিক ভারসাম্যহীন। জেলার অন্য একটি হোমে রয়েছে। খড়গ্রামের হোমের ওই কিশোরী হোমেই জীবনের ১৬টি বছর কাটানোর পর এবছর মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসেছে। এদিকে এদিন সকালে ওই পাঁচ পরীক্ষার্থী একসঙ্গে হোম থেকে বেরিয়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে দিকে রওনা দেয়। ওইসময় তাদের প্রত্যেকের চোখ ছলছল করছিল। ওই আদিবাসী কিশোরী জানায়, জীবনের দুঃখের দিনগুলি ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করি পড়াশুনার মাধ্যমে। কিন্তু কিছু জিনিস পিছু ছাড়ে না। এর মধ্যেও আমরা স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি। আমাদের এই চোখের জল আনন্দের, খুশির। জীবনের মূল স্রোতে ফিরে আসার লড়াইয়ের জল।এবিষয়ে হোম সুপার মিঠু মণ্ডল বলেন, একসঙ্গে পাঁচ কিশোরী মাধ্যমিকে বসল এটা আমাদের কাছে অতি গর্বের। ওই কিশোরীদের মূল স্রোতে ফিরে আসার লড়াইকে কুর্নিশ জানাই।