বাপ্পাদিত্য রায়চৌধুরী ও প্রীতেশ বসু, কলকাতা: বাজেট-জুমলা। এই একটি শব্দেই নির্মলা সীতারামনের রবিবারের ঢক্কানিনাদকে ব্যাখ্যা করতে নেমেছে বিরোধীরা। আর তার হাতে গরম প্রমাণ, পরিসংখ্যান। মোদি সরকারই খাতায়-কলমে তা প্রকাশ করেছে। তাতে সাফ দেখা যাচ্ছে জল জীবন মিশনের মতো পরিষেবা হোক, কিংবা বেকারত্ব মেটানোর দাবিতে পিএম ইন্টার্নশিপ স্কিম—সবটাই লোক দেখানো ভাঁওতা। এর উজ্জ্বল উপস্থিতি শুধুই ঘোষণা এবং টেবল চাপড়ানোয়। বাস্তবে হয় সংখ্যাতত্ত্বের মারপ্যাঁচ, না হলে ব্যর্থতার রেকর্ড।প্রথমেই আসা যাক জল জীবন মিশনে। ঘরে ঘরে জল পৌঁছানোর দাবি এবং তার কৃতিত্ব, দুটোই জাহির করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং তাঁর অনুগামীরা। কেন্দ্রীয় মন্ত্রকের পক্ষ থেকে এই প্রকল্পে বাংলার অগ্রগতি নিয়ে প্রশংসাও করা হয়েছিল। কারণ, বাংলায় এ পর্যন্ত ৯৯ লক্ষ ৩১ হাজার ৯৯৩টি বাড়িতে পানীয় জলের সংযোগ দেওয়া হয়েছে। অথচ, ২০২৪ সালের আগস্ট মাস থেকে জল জীবনের টাকা বন্ধ। আর তা শুধু বাংলায় নয়! সব রাজ্যই এই প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে বঞ্চিত। অথচ গত অর্থবর্ষ, অর্থাৎ ২০২৫-২৬’ জল জীবন মিশনে ৬৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করেছিল মোদি সরকার। বছর শেষে দেখা গিয়েছে, এর মধ্যে খরচ মাত্র ১৭ হাজার কোটি (রিভাইসড এস্টিমেট)। এর আগের অর্থবর্ষ, অর্থাৎ ২০২৪-২৫’এও কিন্তু এতে ২২ হাজার ৬১২ কোটি টাকা খরচ দেখানো হয়েছিল। প্রশ্ন হল, দু’বছর ধরে কোনও রাজ্য যদি এই প্রকল্পে টাকা না পেয়ে থাকে, তাহলে এই বিপুল বরাদ্দ অর্থ গেল কোথায়? রবিবার যে বাজেট অর্থমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন, তাতে ৬৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে বলে ঢাক পিটিয়েছে সরকার। জুমলা এখানেই। যদি ধরেও নেওয়া যায়, ১৭ হাজার কোটি টাকা গত অর্থবর্ষে জল জীবনে খরচ হয়েছে, তাহলে বাকি ৫০ হাজার কোটি তো তহবিলেই ছিল! সেক্ষেত্রে বরাদ্দ বৃদ্ধির কৃতিত্ব দাবিকে স্রেফ ভাঁওতা বলছে ওয়াকিবহাল মহল।অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী ইন্টার্নশিপ স্কিম। ২০২৪ সালের অক্টোবরে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়েছিল। মোদি দাবি করেছিলেন, ১ লক্ষ ২৭ হাজার নিয়োগ হবে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থায়। তখনই প্রশ্ন উঠেছিল, প্রাইভেট কোম্পানি সরকারের কথায় লোক নেবে কেন? তাও বেসরকারি সংস্থাগুলির পক্ষ থেকে সেবার ৮২ হাজার অফার লেটার ইস্যু হয়েছিল। কিন্তু কতজন যুবক-যুবতী তা গ্রহণ করেছিলেন? মাত্র ২৮ হাজার। দ্বিতীয় দফাতেও সাড়া দিয়েছিলেন মাত্র ২৪ হাজার ৬০০ জন। একে ব্যর্থতার নতুন রেকর্ড ছাড়া আর কীই বা বলা যায়? পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫-২৬ সালের জন্য ইন্টার্নশিপ স্কিমে অর্থবরাদ্দ হয়েছিল ১০ হাজার ৮৩১ কোটি টাকা। বছরের শেষ লগ্নে পরিবর্তিত বাজেটে দেখা যাচ্ছে, খরচ হয়েছে ৫২৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র ৫ শতাংশ খরচ। এর থেকেই স্পষ্ট, প্রধানমন্ত্রীর নামাঙ্কিত এই প্রকল্পে যে কেন্দ্রও হতাশ। তাই আগামী অর্থবর্ষের জন্য এই খাতে বরাদ্দ হয়েছে মাত্র ৪ হাজার ৭৮৮ কোটি টাকা। সেক্ষেত্রে বোঝাই যাচ্ছে, মোদি সরকারের পাঁচ বছরে এক কোটি ইন্টার্নশিপের যে দাবি ছিল, তা প্রতিশ্রুতির অন্ধকারেই ডুবে গিয়েছে। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত এই প্রকল্পের অধীনে ইন্টার্নশিপ শেষ করেছেন মাত্র ২ হাজার ৬৬ জন। অর্থাৎ, একে চাকরি বা তার বিকল্প হিসেবেও ভাবছে না ভারতের যুব প্রজন্ম। বেকারত্ব নির্মূলের ঢাল হিসাবে কেন্দ্র ইন্টার্নশিপ স্কিমকে যতই ব্যবহার করুক না কেন, ওই ৬ হাজারি ‘ব্যবস্থাপনা’ চাকরির সমতুল নয়। আসল চিত্র এটাই। পরিষেবা বা কর্মসংস্থান, থেকে যাচ্ছে অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতাতেই। সাধারণ মানুষ তার ছোঁয়াও পাচ্ছে না। এটাই হয়তো মোদি সরকারের ‘আচ্ছে দিন’।