• বঙ্গভবনে সার্চ! বাংলার পুলিশ যাচ্ছে দিল্লিতে, নতুন করে সংঘাত?
    এই সময় | ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • এই সময়, নয়াদিল্লি: ‘সার’ সংঘাত এ বার রাজধানীর রাজপথে! আর নির্বাচন কমিশন (ইসি) ছাপিয়ে রাজ্যের সঙ্গে এখন সংঘাত বাধল দিল্লি পুলিশের।

    ভোটার লিস্টে স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (সার) ইস্যুতে বাংলার প্রতিবাদ দিল্লি পর্যন্ত পৌঁছে দিতে রবিবারই দিল্লি পৌঁছেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পশ্চিমবঙ্গে ‘সার’ প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকে আতঙ্কে অসুস্থ হয়ে যাঁরা মারা গিয়েছেন, তেমন কয়েকজনের পরিজনও পৌঁছেছেন দিল্লিতে। পাশাপাশি খসড়া ভোটার লিস্টে ‘মৃত’ বলে দেখানো হয়েছে, এমন কয়েকজনকেও দিল্লিতে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

    দিল্লিতে রাজ্য সরকারের অতিথিশালা দু’টি বঙ্গভবন এবং গ্রেটার কৈলাসে আর একটি অতিথিশালায় আছেন তাঁরা৷ এই সব জায়গায় ঘরে ঢুকে দিল্লি পুলিশ তল্লাশি চালাচ্ছে, এই অভিযোগে এ দিন সকালেই তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন মমতা। রাজপথে নেমে দিল্লি পুলিশের অফিসারদের আঙুল উঁচিয়ে হুঁশিয়ারিও দিতে দেখা যায় তাঁকে। আজ, মঙ্গলবারও দিল্লিতে রয়েছেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। আগামিকাল, বুধবার তাঁর ফেরার কথা। তার আগে মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তায় বেনজির ভাবে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের বড় বাহিনী পাঠানো হচ্ছে দিল্লিতে। সূত্রের খবর, এক ডিএসপি এবং এক জন ইনস্পেক্টরের নেতৃত্বে ২২ জনের টিম পাঠানো হচ্ছে। পাশাপাশি র‌্যাফের সেকেন্ড ব্যাটেলিয়নও যাচ্ছে। সোমবার রাত ১টা ৪০–এর ফ্লাইটেই এই টিমের দিল্লি পৌঁছনোর কথা।

    এর আগেও বাংলায় কথা বললে বাংলাদেশি তকমা দিয়ে হেনস্থার অভিযোগ উঠেছিল দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে। তবে মমতা নিজে দিল্লিতে থাকাকালীন তাঁর নিরাপত্তায় রাজ্য পুলিশের বড় টিম পাঠানোর নজির সাম্প্রতিক অতীতে নেই বলেই মনে করছেন অনেকে। কেন্দ্র–রাজ্য রাজনৈতিক টানাপড়েনে এই পদক্ষেপ নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে বলে মন‍ে করছেন অনেকে।

    দিল্লি পুলিশ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অতিথিশালায় ঢুকে হেনস্থা করছে, এই খবর পেয়ে এ দিন সকালে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সঙ্গে নিয়েই নিজের সাউথ অ্যাভিনিউয়ের বাসভবন থেকে বেরিয়ে পড়েন মমতা৷ চাণক্যপুরী এবং দিল্লির হেইলি রোডের বঙ্গভবনে পৌঁছে দিল্লি পুলিশকে পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন তিনি৷ তাঁর হুঁশিয়ারি, ‘বাংলার মানুষকে এ ভাবে হেনস্থা, নির্যাতন করবেন না। (সার চলাকালীন) অনেকে মারা গিয়েছেন। অনেকে প্রিয়জনকে হারিয়েছেন। আমাদের গায়ের জোর দেখাবেন না। সকাল থেকে বঙ্গভবন কেন্দ্রীয় বাহিনী ও পুলিশ দিয়ে ভর্তি করে দিল। ঘরে ঘরে তল্লাশি চালাচ্ছে। এটা দিল্লি পুলিশ করতে পারে না। ওদের এক্তিয়ার নেই।’ তাঁর সংযোজন, ‘আমি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে (অমিত শাহ) অনুরোধ করছি এগুলি দেখতে। আপনি বাংলায় এলে রেড কার্পেট পেতে রাখি। আর আমরা দিল্লিতে এলে কালো কার্পেট? যদি ওঁদের (সার চলাকালীন স্বজনহারা) জন্য এই দেশে আর কেউ না-ও লড়ে, আমি লড়ব।’

    বাংলা থেকে আসা এই পরিবারগুলিকে আশ্বস্ত করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা ভয় পাবেন না৷ আমি আছি৷ এই বঙ্গভবন দিল্লি পুলিশের জায়গা নয়৷ এখানে দিল্লি পুলিশ এসে কিছুই করতে পারবে না৷ যে কোনও সমস্যায় আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন৷’ দিল্লি পুলিশের উদ্দেশে আবেদন জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘বঙ্গভবনের বাইরে অস্বাভাবিক হারে নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করায় ভিতরে থাকা সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন। আমরা বিক্ষোভ দেখাতে আসিনি। আমাদের হয়রান করবেন না। আমাদের চ্যালেঞ্জ করবেন না। আমরা ডেঞ্জারাস হয়ে উঠতে পারি।’ তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেকও বঙ্গভবনে থাকা পরিবারগুলির সঙ্গে আলাদা করে কথা বলে তাঁদের আশ্বস্ত করেন৷

    এ দিন দিল্লির গ্রেটার কৈলাসে অবস্থিত রাজ্য সরকারের অতিথিশালায় থাকা ‘সার’–এ ক্ষতিগ্রস্ত বঙ্গবাসীদের হেনস্থা করছে দিল্লি পুলিশ— এই খবর পেয়ে সেখানে ছুটে যান তৃণমূল কংগ্রেসের লোকসভার মুখ্য সচেতক কাকলি ঘোষ দস্তিদার, সাংসদ দোলা সেন, বাপি হালদার এবং সাকেত গোখলে৷ দিল্লি পুলিশের অনৈতিক, আমনবিক আচরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন তাঁরা৷ সবার সঙ্গেই দিল্লি পুলিশের তীব্র বচসা হয়৷ এক মহিলা পুলিশকর্মী কাকলির পরিচয়পত্র দেখতে চাইলে তৃণমূল সাংসদ তাঁকে বলেন, ‘আমার গলায় তো সাংসদের কার্ড ঝোলানো আছে। তারপরেও আপনারা হেনস্থা করছেন কেন?’

    যদিও বাংলার মানুষের হেনস্থার খবর শুনে মুখ্যমন্ত্রী বাড়ির কাপড় পরে বাইরে চলে আসার বিষয়ে কটাক্ষ ছুড়ে দিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। তিনি বলেন, ‘উনি নাকি বাড়ির কাপড় পরে বেরিয়ে এসেছেন, কিন্তু মাইক্রোফোন আনতে ভোলেননি। পুরো ড্রামা করা হয়েছে। দিল্লি পুলিশ সম্মান দিয়ে সরে গিয়েছে।’

    হেনস্থার অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে দি‍ল্লি পুলিশও। এ দিন বিকেলে সাংবাদিক বৈঠক করে দিল্লি পুলিশের তরফে বলা হয়, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জ়েড প্লাস নিরাপত্তা পান। তিনি দিল্লিতে আসছেন, এটা পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের কাছ থেকে জানতে পেরে আমরা প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছিলাম। কোথাও কোনও হোটেল বা অতিথিশালায় ঢুকে কাউকে হেনস্থা করা হয়নি।’ তাঁর সংযোজন, ‘বাংলার একটি রাজনৈতিক দলের তরফ থেকে একশো–দেড়শো জন সমর্থক দিল্লিতে এসে বিভিন্ন প্রান্তের হোটেলে উঠেছেন বলে আমাদের কাছে খবর আসে। যেহেতু এখন সংসদের বাজেট অধিবেশন চলছে, তাই আইন–শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার কারণে আমরা সংশ্লিষ্ট হোটেল বা অতিথিশালার সামনে বড় ফোর্স মোতায়েন রেখেছিলাম।’ এই ব্যাপারে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের কর্তাদের সঙ্গে তাঁরা যোগাযোগ রাখছেন বলেও দিল্লি পুলিশের ওই কর্তা জানান।

  • Link to this news (এই সময়)