এই সময়: বাংলার দুয়ারে ভোট। এমনিতেই প্রায় সব সময়ে রাজনৈতিক আকচাআকচির আঁচ পোহানো বাংলায় ভোট যত এগোচ্ছে, উত্তেজনাও বাড়ছে। এ রাজ্যে রাজনৈতিক হানাহানির ইতিহাস সুদীর্ঘ। এই পরিপ্রেক্ষিতেই সোমবার কলকাতা হাইকোর্ট প্রায় নজিরবিহীন নির্দেশে জানিয়েছে, বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাদের উপরে বা তাঁদের গাড়িতে কোনও ভাবেই যাতে হামলা না হয়, সব দিক থেকে তা নিশ্চিত করতে হবে রাজ্যকে। বিরোধী দলের বিধায়ক, সাংসদ, কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের কর্মসূচিতে যাতে অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, তা সুনিশ্চিত করতে কলকাতা এবং রাজ্য পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছে প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল এবং বিচারপতি পার্থসারথি সেনের ডিভিশন বেঞ্চ। ১৮ তারিখ হবে পরবর্তী শুনানি। আইনজীবীরা বলছেন, ২০২১–এ বিধানসভা ভোট–পরবর্তী হিংসা নিয়ে যে ভাবে কড়া পদক্ষেপ করেছিল হাইকোর্ট, এ বার ভোটের আগে আদালত আগাগোড়া সক্রিয়তা দেখালে অন্য রকম ভোট দেখতেও পারে বাংলা। সোমবারের নির্দেশ শান্তিরক্ষায় শাসকশিবিরের অতিরিক্ত দায়িত্বও স্মরণ করিয়েছে বলে মত আইনজীবীদের।
বিরোধী নেতাদের মিথ্যে মামলা দিয়ে হেনস্থা করা, তাঁদের উপরে হামলা–সহ নানা অভিযোগে জনস্বার্থ মামলা করেছিলেন বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী ও আর এক বিজেপি বিধায়ক শঙ্কর ঘোষ। শুভেন্দু অভিযোগ করেছিলেন, পুলিশকে আগেভাগে জানানোর পরেও বিরোধী দলের কর্মসূচি, কনভয়ে হামলা হচ্ছে। সেই মামলার শুনানির মধ্যেই কিছু দিন আগে পশ্চিম মেদিনীপুরের চন্দ্রকোণায় শুভেন্দুর গাড়িতে হামলার পরে উল্টে তাঁর ও সঙ্গীদের বিরুদ্ধে ‘মিথ্যে মামলা’ দায়ের করার অভিযোগ তোলা হয় বিরোধী দলনেতার তরফে। সেই এফআইআর খারিজে জনস্বার্থ মামলার শুনানিতেই আবেদন করেন শুভেন্দুর আইনজীবী।
গত সপ্তাহে ওই এফআইআরের বিষয়টিতে শুভেন্দুকে রক্ষাকবচ দিয়েছিল প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চ। এ দিন ফের মামলাটি উঠলে রাজ্যের কৌঁসুলি অর্ক নাগ শুনানি পিছোনোর আবেদন করেন। অন্য দিকে, এই সময়ের মধ্যে নতুন করে যাতে কোনও বিরোধী নেতা হেনস্থার শিকার না হন, তা নিশ্চিত করার আবেদন করেন শুভেন্দুর আইনজীবী। রাজ্যের কৌঁসুলি এমন কোনও নির্দেশদানে আপত্তি জানালেও আদালত জানায়—কোনও ভাবেই যাতে নতুন করে কোনও বিরোধী নেতা হামলার মুখে না পড়েন, রাজ্যকে তার নিশ্চয়তা দিতে হবে।
এই নির্দেশ জেনে শুভেন্দুর প্রতিক্রিয়া, ‘আমরা প্রত্যেকে (বিজেপির অনেকে) কেন্দ্রীয় বাহিনীর সুরক্ষায় রয়েছি। জেড প্লাস থেকে এক্স, ওয়াই ক্যাটিগরি নিরাপত্তায় যাঁরা রয়েছি— হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়েছে, রাস্তায় যখন যাওয়া–আসা করব, কেউ বাধাবিঘ্ন তৈরি করতে পারবে না। যদি বাধা সৃষ্টি করা হয়, রাজ্য প্রশাসনের দায়িত্ব সেই বাধা সরানোর।’ শাসকদল তৃণমূলকে বিঁধে শুভেন্দুর মন্তব্য, ‘এদের অসভ্যতা আপনারা দেখেছেন। বিপ্লব দেবের সভায় মঞ্চ পুড়িয়েছে। দিবাকর ঘরামির (বাঁকুড়ার সোনামুখীর বিধায়ক) উপরে আক্রমণ হয়েছে। কেন্দ্রীয় সুরক্ষায় যাঁরা রয়েছেন, তাঁদের সামনে এরা জমায়েত তৈরি করছে।’
এই জমায়েতকারীদের নিয়ে শুভেন্দুর দাবি, ‘এরা অধিকাংশ রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি মুসলিম। কারও হাতে কেরোসিনের জার, পেট্রোলের জার—পুড়িয়ে মারার জন্যে। বাংলাদেশে জামাতিরা যা করছে তা দেখে এখানে তা কার্যকর করতে চায়। যখন আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে তখন নিরুপায় হয়ে কোর্টে যেতে হয়। আমরা আইনের আশ্রয় নিয়েছি।’ অন্য দিকে, তৃণমূলপন্থী আইনজীবীদের প্রশ্ন, এই যে যাকে–তাকে যখনখুশি রোহিঙ্গা, বাংলাদেশি, জামাত বলে দাগিয়ে বিরোধী দলনেতা সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়াচ্ছেন, ২০২১–এর ভোটে মুখ্যমন্ত্রীকেও একই ভাষায় আক্রমণ করেছিলেন—তা কি আইনের চোখে অপরাধ নয়?
তবে জনপ্রতিনিধি, নেতাদের বিষয়ে আদালতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশে সাধারণ রাজনৈতিক কর্মীরা আক্রান্ত হওয়া থেকে বাঁচবেন কি না, সে নিয়ে সংশয় থাকছে বলেই মত আইনজীবীদের। আবার শুধু বিজেপির নেতানেত্রী নন, সিপিএম–কংগ্রেস–আইএসএফ–এসইউসিআইয়ের মতো বিরোধী দলের নেতা–কর্মীরাও বার বার বাধা ও হামলার মুখে পড়েছেন বলে মনে করিয়েছেন ওই সব দলের মুখপাত্ররা।