• ৬৫ বর্গকিমি থেকে কমে ৪২, তীব্র অস্বস্তিরক্ষার যুদ্ধে শহুরে জলাভূমি
    এই সময় | ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • কুবলয় বন্দ্যোপাধ্যায়

    সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ সায়েন্স সিটির সামনে এক–এক করে জমা হচ্ছিলেন ওঁরা। কলকাতার স্থানীয় ইতিহাস নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করা সংগঠন ‘পুরোনো কলকাতার গল্প’ এবং ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল ট্রাস্ট ফর আর্ট অ্যান্ড কালচারাল হেরিটেজ (ইনটাক)–এর কলকাতা অধ্যায়ের সদস্যরা। রবিবার ২ ফেব্রুয়ারি ওয়ার্ল্ড ওয়েটল্যান্ড ডে উপলক্ষে ওঁদের এই জমায়েত। পরিকল্পনা ছিল— চৌবাগা, ধাপা, বামনঘাটা পাম্পিং স্টেশন থেকে লালকুঠি হয়ে খেয়াদহ গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকা পরিদর্শন। এক কথায়, কলকাতার পূর্ব দিকে বিস্তৃত জলাভূমি কেমন আছে, সেটাই খতিয়ে দেখা।

    বিষয়টা প্রথম নজরে এসেছিল প্রায় ৩৪ বছর আগে ১৯৯২–এ। পিপল ইউনাইটেড ফর বেটার লিভিং ইন কলকাতা (পাবলিক) নামে একটি বেসরকারি জনকল্যাণকর সংস্থা কলকাতা হাইকোর্টে জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেছিল পূর্ব কলকাতার প্রায় ২৫ হাজার একর জুড়ে বিস্তৃত জলাভূমিকে আইনি সুরক্ষার আওতায় আনার জন্যে। এক অনাবাসী ভারতীয়কে ‘ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার’ নির্মাণের জন্যে রাজ্য সরকার জলাভূমির অন্তর্গত ২২৭ একর জমি বরাদ্দের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তা রুখতেই ওই জনস্বার্থ মামলা। এর ১০ বছর পরে ২০০২–এ পূর্ব কলকাতার এই জলা অঞ্চলকে ‘রামসার সাইট’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ১৯৭১–এ ইরানের রামসার শহরে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল— পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ জলা অঞ্চলগুলিকে চিহ্নিত করে তাদের ‘রামসার সাইট’ তকমা দেওয়া হবে। এই তকমা পাওয়া জলাভূমিতে কোনও ভাবেই এমন কিছু করা যাবে না যার ফলে তাদের চরিত্র বদল হয়। ১৯৭১ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত ৫৫ বছরে পৃথিবীতে এমন আড়াই হাজার জলাভূমিকে ‘রামসার সাইট’ চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ভারতেই ‘রামসার সাইট’–এর সংখ্যা ৯৮। তারই অন্যতম ইস্ট ক্যালকাটা ওয়েট‍‍ল্যান্ড।

    পূর্ব কলকাতার জলা এলাকাকে রক্ষা করার জন্য জনস্বার্থ মামলা দায়েরের ৩০ বছর এবং ওই এলাকা ‘রামসার সাইট’ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ২০ বছর পরে ২০২১–এ ওই জলা এলাকায় সমীক্ষা চালিয়ে দেখা গিয়েছে, ইস্ট কলকাতা ওয়েটল্যান্ড ১৯৯১–তে ৬৫ বর্গ কিলোমিটার এলাকা থেকে কমতে কমতে ৩৬ শতাংশ জায়গা হারিয়ে ৪২ বর্গ কিলোমিটার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে জলাভূমির সঙ্কোচন ওই জায়গাতেই আটকে থাকেনি। রবিবার বিশ্ব জলাভূমি দিবসের প্রাক্কালে ওই এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে পুরোনো কলকাতার গল্প ও ইনটাকের সদস্যরা দেখলেন, জলাভূমির এলাকা সঙ্কোচন হয়েই চ‍লেছে। অতি–সম্প্রতি আনন্দপুরের নাজিরাবাদের অগ্নিকাণ্ডেও বিষয়টি ফের সামনে এসেছে।

    ইনটাক–এর কলকাতা অধ্যায়ের প্রধান জিএম কাপুর বলেন, ‘এই জলাভূমি আমাদের সবার কাছে প্রকৃতির উপহার। এর স্বাস্থ্যের উপরে আমাদের সবার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। কিন্তু যে ভাবে নিয়মিত জলাভূমি দখল এবং বর্জ্য ফেলার জায়গা হিসেবে এই জলাভূমিকে ব্যবহার করে ধ্বংস করা হচ্ছে, সেটা না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না।’ ‘পুরোনো কলকাতার গল্প’–র পক্ষ থেকে জয়ন্ত সেন ও স্বর্ণালী চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘প্রতিদিন কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকা থেকে অন্তত পাঁচ হাজার টন বর্জ্য এখানে ফেলা হচ্ছে। ৯১ কোটি লিটার নোংরা জল এই জলাভূমিতে প্রবেশ করছে।’

    ‘কলকাতার কিডনি’ হিসেবে পরিচিত এই জলা অঞ্চলকে এখন প্রতিদিন বাঁচার লড়াই লড়তে হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানেন না তাঁরা একটি ‘রামসার সাইট’–এ বসবাস করছেন। এমনকী কাকে ‘রামসার সাইট’ বলা হয়, তার গুরুত্ব কতটা—সেটাও তাঁদের অনেকেরই অজানা। অসচেতনতা এবং অপরিকল্পিত কর্মসূচির সঙ্গে অসম যুদ্ধে কি আদৌ এঁটে উঠতে পারবে পূর্ব কলকাতার এই জলাভূমি? সংশয় থেকেই যাচ্ছে।

  • Link to this news (এই সময়)